সপ্তম পর্ব
শহরের নিয়ম বড় অদ্ভুত। এখানে মানুষকে প্রথমে উপেক্ষা করা হয়, তারপর অপমান করা হয়, তারপর ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়া হয়। কিন্তু সময়ের এক অদ্ভুত খেলায়, সেই মানুষটিকেই আবার একদিন আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা হয়। তখন তার নাম নিয়ে গল্প হয়, স্মৃতিচারণ হয়, প্রশংসা হয়। যেন যারা একসময় তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল, তারাই আবার তাকে নিজেদের মানুষ প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
কুদ্দুস এই শহরের সেইসব মানুষেরই একজন।
বরং বলা যায়, এই শহরের নির্মম নিয়মের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ সে।
দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর সাংবাদিকতা করেও সে প্রেসক্লাবের সদস্যপদ পায়নি। আবেদন করেছে বহুবার। প্রতিবারই কোনো না কোনো অজুহাতে তার নাম বাদ গেছে। কখনো বলা হয়েছে—সে অতিরিক্ত সত্যবাদী। কখনো বলা হয়েছে—তার আচরণ বেশি কঠোর। কেউ কেউ তাকে “অসামাজিক” বলেও অপবাদ দিয়েছে।
আর অনেকে সরাসরি বলেছে—“কুদ্দুস বেয়াদব।”
এই “বেয়াদব” শব্দটা ধীরে ধীরে তার নামের সঙ্গেই জুড়ে গিয়েছিল।
যারা ক্ষমতার কাছে মাথা নত করতে জানে, যারা চাটুকারিতাকে ভদ্রতা বলে চালিয়ে দেয়, তাদের কাছে কুদ্দুস সত্যিই সমস্যার মানুষ। কারণ সে মিথ্যা প্রশংসা করতে জানত না। অন্যায়ের সামনে নীরব দাঁড়িয়ে থাকতেও পারত না।
এই কারণেই তাকে দূরে রাখা হয়েছিল।
যে ক্লাবে হাসপাতালের মালিক সদস্য হতে পারে, ব্যবসায়ী সদস্য হতে পারে, রাজনৈতিক পরিচয়ে অনেকেই জায়গা পেতে পারে—সেই ক্লাবে একজন প্রবীণ সাংবাদিক হয়েও কুদ্দুস জায়গা পায়নি।
এ নিয়ে কম আলোচনা হয়নি।
কেউ বলেছে—কুদ্দুস উদ্ধত।
কেউ বলেছে—সে সত্যবাদী।
কেউ বলেছে—ভালো মানুষ।
আবার যারা লোভ আর সুবিধার ভেতরে বাস করে, তারা বলেছে—“ও বেয়াদব।”
কুদ্দুস কখনো এসব অভিযোগের জবাব দেয়নি।
কারণ সে জানত, এই শহরে সব সত্যি মুখে বলে প্রমাণ করা যায় না। কিছু সত্যি সময় নিজেই প্রমাণ করে।
আর সময় ধীরে ধীরে তার পক্ষেই কথা বলতে শুরু করেছিল।
প্রেসক্লাব তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষ তাকে কাছে টেনে নিয়েছিল।
এই শহরের ভেতরে আরেকটা শহর আছে। সেখানে বড় বড় ভবন নেই, বড় বক্তৃতা নেই, ব্যানার নেই, আলো নেই। সেখানে আছে মানুষের ক্লান্ত মুখ, ভাঙা স্বপ্ন, বেঁচে থাকার প্রতিদিনের যুদ্ধ।
সেই শহরের মানুষ কুদ্দুসকে অন্যভাবে চিনত।
একদিন ভোরে খবর এল—একজন প্রবীণ সাংবাদিক গুরুতর অসুস্থ। পরিবারের পক্ষে চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। সহকর্মীরা দৌড়ঝাঁপ করছে, কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না।
খবরটা শোনার পর কুদ্দুস কোনো স্ট্যাটাস দিল না। কোনো আবেগঘন বক্তৃতাও করল না।
সে শুধু হাসপাতালে গিয়ে দাঁড়াল।
হাসপাতালের করিডোরে তখন চাপা উদ্বেগ। সাদা চাদরে ঢাকা রোগী নিঃশব্দে শুয়ে আছেন। পাশে ক্লান্ত স্ত্রী, উদ্বিগ্ন সন্তান। বাইরে কয়েকজন সাংবাদিক চুপচাপ বসে।
কুদ্দুস নিঃশব্দে কাজ শুরু করল।
সে কাউকে বলল না—“আমি দায়িত্ব নিয়েছি।”
কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করল না—“আমি বড় কিছু করছি।”
সে শুধু মানুষের ফোন নম্বর জোগাড় করল। পুরোনো সহকর্মীদের ফোন দিল। পরিচিত কয়েকজনকে সাহায্যের কথা বলল। যাদের বিবেক এখনো পুরোপুরি মরে যায়নি, তাদের একে একে জাগিয়ে তুলল।
একদিনের মধ্যেই ছোট্ট একটা সাহায্য তহবিল দাঁড়িয়ে গেল।
মানুষ অবাক হয়ে দেখল—যে মানুষটাকে তারা “বেয়াদব” বলে চিনত, সেই মানুষটাই নিঃশব্দে সবার আগে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
অসুস্থ সাংবাদিক একদিন চোখ খুলে কুদ্দুসকে দেখে দুর্বল গলায় বললেন,
—তুমি এভাবে করছো কেন?
কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত স্বরে বলল,
—কারণ আপনি আমার চেয়ে ভালো সাংবাদিক।
লোকটার চোখ ভিজে উঠল।
এই শহরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও কখনো কখনো কঠিন হয়ে যায়।
কিন্তু কুদ্দুস এখানেই থামেনি।
সে শুধু একজন মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি, ধীরে ধীরে একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
যখনই কোনো গরিব পরিবারের কথা শুনত—যেখানে চিকিৎসা নেই, যেখানে টাকার অভাবে সন্তান স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে চাকরি হারিয়ে কেউ ভেঙে পড়েছে—কুদ্দুস সেখানে গিয়ে দাঁড়াত।
কখনো সাহায্য নিয়ে।
কখনো প্রতিবাদ নিয়ে।
তার হাতে বড় কোনো ফান্ড ছিল না। বড় কোনো সংগঠনও ছিল না।
শুধু একটা বিশ্বাস ছিল—
মানুষ এখনো মানুষকে বাঁচাতে পারে।
ধীরে ধীরে শহরের সোশ্যাল মিডিয়াও তাকে খুঁজে পেতে শুরু করল।
প্রথমে ছোট ছোট ভিডিও ছড়াল—
“বেয়াদব সাংবাদিক গরিবের পাশে।”
তারপর ছবি উঠল—
“অদ্ভুত মানুষ কুদ্দুস।”
তারপর পোস্ট বাড়তে লাগল।
যে মানুষটাকে একসময় ক্লাবের জন্য অযোগ্য বলা হয়েছিল, সেই মানুষটাই এখন মানুষের গল্পে জায়গা করে নিচ্ছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—একই ক্লাবের কিছু সদস্য এখন তাকে নিয়ে গর্বের পোস্ট দিচ্ছে।
যারা একসময় বলেছিল—
“এই লোকটা সমস্যা তৈরি করে।”
তারাই এখন লিখছে—
“আমাদের প্রিয় সহকর্মী কুদ্দুস সমাজের জন্য কাজ করছেন।”
কুদ্দুস এসব দেখে শুধু মৃদু হাসত।
সে জানত, এই শহরের স্মৃতি খুব সুবিধাবাদী।
যখন তুমি একা থাকো, তখন তুমি “বেয়াদব”।
আর যখন মানুষ তোমাকে নিয়ে কথা বলতে শুরু করে, তখন তুমি “আমাদের গর্ব”।
একদিন বিকেলে কয়েকজন তরুণ সাংবাদিক তার কাছে এল।
তাদের চোখে উচ্ছ্বাস।
একজন বলল,
—কুদ্দুস ভাই, আমরা আপনাকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানাতে চাই।
কুদ্দুস হালকা হেসে বলল,
—আমার উপর ডকুমেন্টারি বানানোর কিছু নাই।
—কেন? আপনি তো অনেক কিছু করছেন। রাজধানীর বুকে ছোট্ট একটা বাগান গড়ে তুলেছেন। সেখানে সাংবাদিকরা বসে আড্ডা দেয়। গাছের নিচে বসে আপনার গল্প করে। অনেকে তো আপনার লাগানো গাছের ফল খেয়েও আনন্দ পায়।
কুদ্দুস শান্ত গলায় বলল,
—আমি কিছু করি না। আমি শুধু মানুষের পাশে দাঁড়াই।
তরুণরা চুপ হয়ে গেল।
একজন কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল,
—আপনাকে তো আগে সবাই অপমান করত। এখন সবাই আপনাকে পছন্দ করে। এটা কেমন লাগে?
কুদ্দুস কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—মানুষ পছন্দ করাটা আমার লক্ষ্য না। আমি মানুষ থাকা চাই।
কথাটা শুনে কেউ আর কিছু বলল না।
দিন যেতে লাগল।
ধীরে ধীরে কুদ্দুসের নাম শহরের সাধারণ মানুষ আর সাংবাদিকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। সাংবাদিকদের আড্ডাস্থল, দুপুরের খাবারের জায়গা, ছোট ছোট বিশ্রামকেন্দ্র—এসব রক্ষা করতে তার ভূমিকার গল্প তরুণ সাংবাদিকদের আলোচনায় উঠে আসতে লাগল।
রিকশাওয়ালা তাকে চিনত।
দোকানদার তাকে চিনত।
ছাত্ররা তাকে চিনত।
কিন্তু প্রেসক্লাবের ভেতরের মানুষগুলোও এখন তার কথা বলত।
কেউ এখনো ঠোঁট বাঁকিয়ে বলত—
“কুদ্দুস বেয়াদব।”
আবার কেউ বলত—
“আমরাও তাকে চিনি।”
যে মানুষটাকে একসময় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, এখন তার নাম ব্যবহার করেই অনেকে নিজেদের পরিচয় বড় করার চেষ্টা করছে।
একদিন ক্লাবের বাইরে দাঁড়িয়ে কুদ্দুস দেখল, কয়েকজন সদস্য তার কথা বলছে।
একজন হেসে বলল,
—এই তো কুদ্দুস ভাই! দারুণ মানুষ।
কুদ্দুস কিছু বলল না।
তার মনে পড়ে গেল পুরোনো দিনগুলোর কথা।
এই মানুষগুলোই একসময় বলত—
“ও বেয়াদব।”
তবু সে থামেনি।
কারণ সে জানে, মানুষের স্বভাব খুব কম বদলায়। বদলায় শুধু অবস্থান।
এক সন্ধ্যায় এক তরুণ এসে তার পাশে দাঁড়াল।
—কুদ্দুস ভাই, একটা কথা বলি?
—বলো।
—আপনি কি এসব জনপ্রিয়তা উপভোগ করেন?
কুদ্দুস আকাশের দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে বলল,
—আমি জনপ্রিয়তা চাই না। আমি চাই মানুষ অন্যায়ের পাশে চুপ না থাকুক।
তরুণটা চুপ করে রইল।
কুদ্দুস আবার বলল,
—আর একটা কথা মনে রাখো।
—কি?
—সম্মান যারা দেয় না, তারাই পরে স্মৃতিচারণ করে।
বাতাসে কথাটা অনেকক্ষণ ঝুলে রইল।
রাত নেমে এলো।
কুদ্দুস একা হাঁটছিল।
চারপাশে এখন অনেক শব্দ, অনেক আলোচনা, অনেক ছবি, অনেক প্রশংসা।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে জানত—এসব শব্দ স্থায়ী না।
স্থায়ী শুধু কাজ।
মানুষের হৃদয়ে জায়গা কোনো পোস্টে হয় না, সেটা হয় সময়ের পরীক্ষায়।
হাঁটতে হাঁটতে সে আকাশের দিকে তাকাল।
একসময় এই শহর তাকে “বেয়াদব” বলেছিল।
সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত করেছিল।
এখন হয়তো অন্য নামে ডাকে।
কিন্তু কুদ্দুস জানে—তার কাজের নাম একটাই।
মানুষ থাকা।
চলবে........