ঢাকা, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬,
সময়: ১১:৩১:১০ PM

”নিহারিকা”

মান্নান মারুফ
13-05-2026 01:57:23 PM
”নিহারিকা”

পর্ব-৪

“কুদ্দুসের অন্তরে সবসময় নিহারিকা লুকিয়ে থাকতো...”

মানুষের জীবনে কিছু খবর আসে খুব নিঃশব্দে, অথচ ভেতরের পুরো পৃথিবীটাকে ভেঙে দেয়।

সেদিন বিকেলেও আকাশে হালকা মেঘ ছিল। কুদ্দুস প্রতিদিনের মতো লাইব্রেরির জানালার পাশে বসে বই পড়ছিল। বাইরে কদম গাছের পাতায় বাতাস লাগছিল ধীরে ধীরে।

ঠিক তখনই শহরের পুরোনো বন্ধু রফিক এসে বলল,
— “শুনেছিস? নিহারিকার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”

কুদ্দুস প্রথমে কিছু বুঝতেই পারল না।

শব্দগুলো যেন তার কানে পৌঁছেও পৌঁছাল না।

— “ঢাকার এক বড় ব্যবসায়ীর ছেলে। নাকি অনেক ভালো পরিবার।”

রফিক আরও কিছু বলছিল, কিন্তু কুদ্দুস আর শুনতে পারছিল না।

তার মনে হচ্ছিল, হঠাৎ কেউ যেন বুকের ভেতর থেকে বাতাস টেনে নিয়েছে।

তবুও সে মুখে হাসি আনার চেষ্টা করল।

— “ভালো তো।”

শুধু এইটুকুই বলল।

কিন্তু সেই “ভালো তো” শব্দটার ভেতরে কতটা ভাঙাচোরা কষ্ট লুকিয়ে ছিল, সেটা কেউ বুঝতে পারেনি।

সেদিন রাতে কুদ্দুস ঘুমাতে পারেনি।

বারবার মনে পড়ছিল নিহারিকার সেই চিঠিগুলো।

“কিছু মানুষকে মনে রাখতে হয় না। তারা এমনিতেই মনে থাকে।”

তাহলে?

সবকিছু কি শুধু স্মৃতি ছিল?

নাকি সে কখনোই নিহারিকার জীবনে ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, যতটা ভেবেছিল?

মানুষ যখন কাউকে খুব গভীরভাবে ভালোবাসে, তখন সবচেয়ে বড় ভয় হয়—নিজের অনুভূতিটা একতরফা হয়ে যাওয়ার ভয়।

কুদ্দুসেরও সেই ভয় হচ্ছিল।

তবুও সে কাউকে কিছু বলল না।

পরদিনও কলেজে গেল, ক্লাস নিল, বিকেলে লাইব্রেরিতে বসে রইল।

শুধু তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ একটু গভীর হয়ে উঠেছিল।

কয়েকদিন পর ডাকপিয়ন একটি চিঠি এনে দিল।

নিহারিকার লেখা।

কুদ্দুস অনেকক্ষণ খামটা খুলল না।

অদ্ভুত ভয় হচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে খাম খুলে কাগজ বের করল।

“কুদ্দুস,

বাড়িতে আমার বিয়ের কথা চলছে। সবাই খুব খুশি। মানুষ বলে, মেয়েদের জীবন নাকি একসময় অন্য কারও হাতে তুলে দিতে হয়।

জানো, মাঝে মাঝে খুব ভয় লাগে।

নিজেকেই চিনতে পারি না।”

চিঠির শেষদিকে কয়েকটি লাইন কেটে দেওয়া ছিল। কালি ছড়িয়ে গেছে।

মনে হচ্ছিল, লিখতে গিয়ে হয়তো হাত কেঁপে গিয়েছিল।

কুদ্দুস দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তার খুব ইচ্ছে হলো লিখতে—

“বিয়ে কোরো না। আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

কিন্তু সে লিখল না।

কারণ ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে নিজের চেয়েও প্রিয় মানুষের সুখের কথা ভাবতে শেখায়।

সে শুধু উত্তর দিল—

“তোমার সুখের মধ্যেই আমার শান্তি।”

চিঠিটা পোস্ট করার পর কুদ্দুসের মনে হলো, নিজের বুকের ভেতর থেকে যেন কিছু ছিঁড়ে অন্য কারও হাতে তুলে দিল।

অন্যদিকে নিহারিকার ভেতরেও তখন ভয়ংকর এক দ্বন্দ্ব চলছিল।

পরিবারের সবাই বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। মা গয়না দেখছেন, খালা শাড়ি পছন্দ করছেন, আত্মীয়রা ফোন করে অভিনন্দন জানাচ্ছে।

সবকিছুর মাঝেও নিহারিকার মনে হচ্ছিল, সে যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে।

ছেলেটি খারাপ ছিল না। শিক্ষিত, ভদ্র, প্রতিষ্ঠিত।

তবুও কেন জানি তার মনে কোনো অনুভূতি জন্মাচ্ছিল না।

বরং প্রতিবার বিয়ের কথা উঠলেই কালীগঞ্জের সেই লাইব্রেরি চোখের সামনে ভেসে উঠত।

একজন শান্ত ছেলের মুখ মনে পড়ত।

যে খুব কম কথা বলত।

কিন্তু যার নীরবতায় আশ্রয় ছিল।

এক রাতে নিহারিকা পুরোনো একটি বই খুলেছিল।

বইয়ের ভাঁজে হঠাৎ একটি শুকনো কদম ফুল পড়ে গেল।

অনেক বছর আগের।

হয়তো কালীগঞ্জ থেকে নিয়ে এসেছিল।

ফুলটা হাতে নিয়েই তার চোখ ভিজে উঠল।

হঠাৎ সে বুঝতে পারল—কিছু মানুষকে সময় দিয়ে মাপা যায় না।

তারা ধীরে ধীরে মানুষের আত্মার অংশ হয়ে যায়।

আর সেই মুহূর্তেই প্রথমবার সে নিজেকে প্রশ্ন করল—

“আমি কি সত্যিই অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারব?”

উত্তর এল না।

শুধু বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা জমতে লাগল।

এরপর কয়েকদিন কুদ্দুস কোনো চিঠি পেল না।

সে নিজেও লিখল না।

কিন্তু প্রতিদিন রাতে পুরোনো চিঠিগুলো বের করে পড়ত।

কিছু কিছু শব্দে আঙুল ছুঁয়ে থাকত অনেকক্ষণ।

মনে হতো, এটাই হয়তো শেষ।

মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো কখনো পূর্ণ হয় না—শুধু গভীর হয়ে থাকে।

একদিন গভীর রাতে হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।

কুদ্দুস চমকে উঠল।

এত রাতে সাধারণত কেউ ফোন করে না।

ফোন তুলে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

ওপাশেও নীরবতা।

তারপর খুব পরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

— “কুদ্দুস...”

কুদ্দুসের বুক কেঁপে উঠল।

নিহারিকা।

অনেকদিন পর তার কণ্ঠ শুনেও সে কিছু বলতে পারছিল না।

নিহারিকা ধীরে বলল,
— “তুমি ভালো আছো?”

— “হ্যাঁ।”

আবার নীরবতা।

তারপর নিহারিকা খুব নিচু স্বরে বলল,
— “তুমি এত সহজে আমাকে যেতে দিলে?”

কুদ্দুস চোখ বন্ধ করল।

কত শত কথা জমে ছিল তার ভেতরে। অথচ মুখ দিয়ে বের হলো শুধু—
— “তোমার সুখ চাই।”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর নিহারিকার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

— “সব সুখ কি সবাইকে মানায়?”

কুদ্দুস কিছু বলল না।

কারণ সে বুঝতে পারছিল, এই নীরবতার ভেতরেই অনেক উত্তর লুকিয়ে আছে।

সেই রাতেই নিহারিকা প্রথমবার নিজের কাছে স্বীকার করল—

সে অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবে না।

ভালোবাসা কখন যে একজন মানুষের ভেতরে শেকড় গেঁড়ে বসে, মানুষ নিজেও তা বুঝতে পারে না।

কুদ্দুস তার জীবনের অভ্যাস হয়ে গেছে।

তার নীরবতা, তার অপেক্ষা, তার অদ্ভুত মায়া—সবকিছু মিলিয়ে সে এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।

জানালার বাইরে তখন রাতের বৃষ্টি পড়ছিল।

আর নিহারিকা অনুভব করছিল, কিছু সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দূরত্ব হয় ভুল বোঝাবুঝি।

যেখানে দু’জন মানুষই ভালোবাসে, অথচ কেউ মুখ ফুটে বলে না।

চলবে............