ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬,
সময়: ১০:২৪:০০ PM

মাঠের রাজনীতিতে সরব হচ্ছে একটি দল

মান্নান মারুফ
12-05-2026 09:12:49 PM
মাঠের রাজনীতিতে সরব হচ্ছে একটি দল
 

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে একটি বহুল আলোচিত রাজনৈতিক দল। দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠন পুনর্গঠন, তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয়ের পর এবার তারা মাঠের রাজনীতিতে সরব উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও থানায় ছোট ছোট মিছিল, পথসভা ও গণসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মূলত বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রাথমিক প্রস্তুতি।

দলটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী জুলাই-আগস্টের মধ্যে রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি চলছে। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা থেকে নেতাকর্মীরা গোপনে ঢাকায় অবস্থান নিচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য হলো সাংগঠনিক অবস্থান মজবুত করা এবং উপযুক্ত সময় এলে কেন্দ্রীয়ভাবে মাঠে সক্রিয় হওয়া।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিছিল দেখা যাচ্ছে, সেগুলোকে দলটির ‘সাংগঠনিক উপস্থিতি যাচাই’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীরা ছোট আকারে কর্মসূচি পালন করে জনসমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তির মূল্যায়ন করছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর দলটির এ ধরনের তৎপরতা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

দলটির একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমানে তারা কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছেন। তিনি বলেন, “দল এখন প্রকাশ্য সংঘাতে না গিয়ে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। সময় উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি হলেই বড় কর্মসূচিতে যাবে।”

তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলায় সাংগঠনিক যোগাযোগ জোরদার করা হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক সংগঠন নয়, ছাত্র, যুব, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদেরও মাঠে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি প্রশাসনের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের একটি অংশও নেপথ্যে কাজ করছেন বলে দলীয় ও একটি সংস্থা সূত্রের দাবি।

দলটির ভেতরের একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমানে তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সাংগঠনিক ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের সক্রিয় করা। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা সংগঠনটি এবার ধীরে ধীরে রাজনৈতিক মাঠ পুনর্দখলের কৌশল নিয়েছে। এজন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি বিশেষ সমন্বয় টিম গঠন করা হয়েছে, যারা সারা দেশের ইউনিটগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে রেখে দলটি নিজেদের নতুনভাবে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। তারা মনে করছেন, সরাসরি বড় কর্মসূচির আগে ছোট ছোট কর্মসূচির মাধ্যমে সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জনমতও পর্যবেক্ষণ করছে দলটি।

দলটির একাধিক নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে তারা প্রকাশ্য সংঘাত এড়িয়ে চললেও ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে মাঠে সেনা মোতায়েন বা বিশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতি শিথিল হলে তারা আরও সক্রিয়ভাবে মাঠে নামবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন নেতারা। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোনো বক্তব্য দেয়নি।

একজন সাবেক ছাত্রনেতা, যিনি বর্তমানে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন, বলেন, “আমরা এখন সাংগঠনিকভাবে নিজেদের প্রস্তুত করছি। হঠাৎ করে বড় আন্দোলনে যাওয়ার পরিবর্তে ধাপে ধাপে মাঠে নামার কৌশল নেওয়া হয়েছে। কর্মীদের মনোবল ফেরানো এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।”

সূত্র জানায়, আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে সরকারবিরোধী বড় রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করে নতুন নির্বাচনের দাবি জোরালো করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। তাদের ধারণা, ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংগঠনিক চাপের মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যেই এ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানা গেছে। যদিও সরকারি দলের কয়েকজন নেতা দাবি করেছেন, “ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন মিছিল দিয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।” তবে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘ সময় পর মাঠে সক্রিয় হওয়ার এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো দল মাঠে টিকে থাকতে চাইলে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। সেই দিক থেকে দলটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় ভবিষ্যতের বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

এদিকে রাজধানীতে সম্ভাব্য বড় শোডাউনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠ পর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা ও যোগাযোগ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যদিও সরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠা এই দলটির কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ছোট ছোট কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বড় রাজনৈতিক প্রস্তুতির যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা আগামী সময়ের রাজনীতিতে নতুন আলোচনা ও সমীকরণের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।