ঢাকা, সোমবার, ১১ মে ২০২৬,
সময়: ০৩:৩৩:৪৬ PM

স্বস্তিতে নেই বিএনপির দল ছুট বড় বড় নেতারা

মান্নান মারুফ
11-05-2026 02:22:57 PM
স্বস্তিতে নেই বিএনপির দল ছুট বড় বড় নেতারা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলবদল, বিভক্তি এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে বের হয়ে যাওয়া নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি থেকে বের হয়ে যাওয়া বা বহিষ্কৃত কয়েকজন নেতার রাজনৈতিক অবস্থান ও জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিএনপিপন্থী নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, দল ছেড়ে বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া অনেক নেতাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সফল হতে পারেননি। আস্তে আস্তে মানুষের কাছথেকে হারিয়ে গেছে।

দল ত্যাগকরে সাবেক বিএনপি নেতা শাহজাহান ওমর একসময় প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, “রিমোট কন্ট্রোলে কোনো রাজনৈতিক দল চলতে পারে না।” সেই সঙ্গে তিনি বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপি সমর্থকরা। তাদের দাবি, বিএনপি এখন আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে এবং দলটির নেতৃত্বে থাকা তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে শাহজাহান ওমরের রাজনৈতিক অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে বিএনপিপন্থীদের মন্তব্য। একই সঙ্গে জনস্রোত থেকে হারিযে যাচ্ছে।

একইভাবে সাবেক মন্ত্রী ও এলডিপি সভাপতি কর্ণেল অলি আহমদ দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও জিয়া পরিবার নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার ঘোষণার প্রশ্নেও তিনি ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপি সমর্থকদের দাবি, নিজ এলাকাতেও তিনি প্রত্যাশিত জনসমর্থন ধরে রাখতে পারেননি। হারিয়ে যাচ্ছেন রাজনৈতিক মাঠ থেকে ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করা নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি বিএনপি ছাড়ার পর বিকল্পধারা বাংলাদেশ গঠন করেন এবং নিজেকে জাতীয় রাজনীতিতে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজনৈতিক প্রভাব কমতে থাকে। বর্তমানে নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খুব বেশি জানে না বলেও আলোচনা রয়েছে। এই ঐতিহাসিক পরিবারটির কথা মানুষ এখন ভুলে যাচ্ছে।

একইভাবে তৈমুর আলম খন্দকার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দিলেও পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা অনেকটাই কমে গেছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে মন্তব্য করা হচ্ছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাষ্য, দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি বিএনপির সাবেক নেতা ইসহাক সরকার-এর কিছু বক্তব্য নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় বইছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কয়েকটি পোস্টে দাবি করা হয়, বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, আন্দোলন-সংগ্রাম ও তৃণমূলভিত্তিক শক্তিকে অস্বীকার করে ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পোস্টগুলোতে আরও বলা হয়, বিএনপির পরিচয়ের কারণেই অনেক নেতা জাতীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন; কিন্তু দল থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর তাদের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

ওইসব আলোচনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর প্রসঙ্গও উঠে আসে। সেখানে দাবি করা হয়, দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হলেও দলটি শেষ পর্যন্ত সংগঠনগত শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এসব বক্তব্য মূলত বিএনপিপন্থী নেতাকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক শক্তি ও তৃণমূলের সমর্থনই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে বেরিয়ে যাওয়া নেতাদের অনেকেই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেন না। কারণ একটি দলের আদর্শ, সংগঠন এবং কর্মীভিত্তিই রাজনীতিতে টিকে থাকার প্রধান শক্তি।

বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় বিভক্তি সাময়িক আলোচনার জন্ম দিলেও শেষ পর্যন্ত জনগণের সমর্থনই নির্ধারণ করে দেয় কোন নেতা বা দল কতটা প্রভাব ধরে রাখতে পারবে। বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও দলটি এখনও দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।

যুবদল নেতা গিয়াসউদ্দিন মামুন বলেন, বিএনপি একটি আর্দশের উপর গড়ে উঠা দল। এই দলটির নেতা ছিলেন জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া তারা দুজনই বাংলাদেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। সেই দল থেকে দু একজন চলে গেলেও দলের উপর কোন প্রভাব পড়বে না। বরং যারা এই দল থেকে চলে যাবে তারাই হারিয়ে যাবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন রাজনৈতিক মন্তব্যে বলা হচ্ছে, ব্যক্তি পরিবর্তিত হলেও “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”-এর আদর্শ এবং বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে। সময়ই শেষ পর্যন্ত বলে দেবে কোন নেতা রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকবেন আর কে হারিয়ে যাবেন—এমন মন্তব্যও করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।