ঢাকা, রবিবার, ১০ মে ২০২৬,
সময়: ০৯:৪৪:৫৯ PM

মা ও জীবন:ত্যাগ আর অস্তিত্বের সম্পর্ক

মান্নান মারুফ
10-05-2026 08:30:27 PM
মা ও জীবন:ত্যাগ আর অস্তিত্বের সম্পর্ক

মানুষের জীবনে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের নাম ‘মা’। পৃথিবীর সব সম্পর্কের ভিড়ে যে সম্পর্ক নিঃস্বার্থ, নির্মল ও চিরন্তন—তা হলো মা ও সন্তানের সম্পর্ক। একজন মানুষ জন্মের আগেই মায়ের সঙ্গে তার আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়। মায়ের স্পর্শ, ভালোবাসা, ত্যাগ আর মমতায় একজন সন্তান ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে। তাই তো বলা হয়, “মা হারালে সবই হারিয়ে যায়।” সত্যিই, মা না থাকলে পৃথিবীর রঙ যেন ফিকে হয়ে যায়, জীবনের সবচেয়ে বড় ছায়াটিও হারিয়ে যায়।

যার মা নেই, সেই প্রকৃত অর্থে বুঝতে পারে মা না থাকার কষ্ট কত গভীর। পৃথিবীতে তখন অনেক মানুষ থাকলেও মনে হয়, নিজের বলে আর কেউ নেই। কারণ মা শুধু একজন মানুষ নন; মা এক অনুভূতির নাম, এক মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠান। সন্তানের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ব্যর্থতা কিংবা সফলতার প্রতিটি মুহূর্তে সবচেয়ে নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকেন মা। একজন মা তার নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। নিজের কষ্ট গোপন করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটান। তাই মায়ের ঋণ কখনো শোধ করার নয়।

বর্তমান সমাজে মা দিবস ঘিরে নানা আয়োজন দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মায়ের সঙ্গে ছবি পোস্ট করেন, ভালোবাসার কথা লেখেন, উপহার দেন। এটি নিঃসন্দেহে ভালোবাসা প্রকাশের একটি মাধ্যম। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—ভালোবাসা কি কেবল পোস্টে বন্দি? শুধু একটি দিন মাকে স্মরণ করলেই কি সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? বাস্তবতা হলো, মা দিবস আমাদের কেবল স্মরণ করিয়ে দেয়—মায়ের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা যেন প্রতিদিনের আচরণে প্রকাশ পায়।

অনেক সময় দেখা যায়, মা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তিনি পরিবারেই অবহেলার শিকার হন। যে মা সন্তানের জন্য সারাজীবন নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়েছেন, সেই মাকেই শেষ বয়সে একাকিত্বে ভুগতে হয়। এটি শুধু দুঃখজনক নয়, মানবিকতার জন্যও লজ্জার। কারণ মা কোনো নির্দিষ্ট দিনের ভালোবাসা নন; মা প্রতিদিনের শ্রদ্ধা, যতœ ও দায়িত্বের নাম।

একজন মা পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি। পরিবারের সবার খাবার, পড়াশোনা, অসুস্থতা কিংবা মানসিক কষ্ট—সবকিছুর দায়িত্ব তিনি নীরবে বহন করেন। দিনের পর দিন নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে রাখেন, কিন্তু পরিবারের কাউকে বুঝতে দেন না। সন্তানের মুখে একটুখানি হাসি দেখার জন্য তিনি নিজের সবকিছু ত্যাগ করতে পারেন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যোদ্ধা যদি কাউকে বলা হয়, তবে সেই সম্মান নিঃসন্দেহে একজন মায়ের প্রাপ্য।

মায়ের ভালোবাসা নিঃশর্ত। সন্তান ভুল করলেও মা তাকে ক্ষমা করেন, হতাশ হলেও সাহস জোগান, ব্যর্থ হলেও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখান। জীবনের কঠিন সময়ে একজন মা-ই সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। তাই মা শুধু জন্মদাত্রী নন; তিনি সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং প্রথম আশ্রয়।

আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেকেই মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে ভুলে যাই। কর্মব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভরতা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের নানা চাপে আমরা হয়তো ভাবি—মা তো আছেনই। কিন্তু একসময় হঠাৎ করেই সেই ‘আছেন’ শব্দটি অতীত হয়ে যায়। তখন হাজার স্মৃতির মাঝেও মায়ের অনুপস্থিতি মানুষকে ভীষণ একা করে দেয়। তাই মা বেঁচে থাকতে তাঁর মূল্য বোঝা জরুরি। তাঁর সঙ্গে কিছু সময় কাটানো, খোঁজ নেওয়া, ভালোবাসা প্রকাশ করা—এসবই হতে পারে সবচেয়ে বড় উপহার।

মা দিবসের প্রকৃত শিক্ষা এখানেই—মাকে শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতিদিন তাঁর প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালন করা। কারণ পৃথিবীর সব ফুলের সেরা ফুল হলো ‘মা’। মায়ের পায়ের নিচেই সন্তানের জান্নাত, শান্তি ও জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় লুকিয়ে থাকে।

জীবনের প্রতিটি সফলতার পেছনে একজন মায়ের নীরব অবদান থাকে। একজন মা হয়তো কখনো বড় বড় কথা বলেন না, কিন্তু তাঁর ভালোবাসা সন্তানের পুরো জীবনকে আলোকিত করে রাখে। তাই আমাদের উচিত, মায়ের প্রতি ভালোবাসাকে শুধু কথায় নয়, কাজে প্রকাশ করা। তাঁর ত্যাগকে সম্মান করা, তাঁর অনুভূতিকে মূল্য দেওয়া এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর পাশে থাকা। কারণ মা আছেন বলেই পৃথিবী এত সুন্দর, জীবন এত মায়াময়। আর মা নেই মানেই—জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা।