ঢাকা, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬,
সময়: ০২:০৩:০৯ PM

বাগানবাড়ি

মান্নান মারুফ
08-05-2026 12:44:13 PM
বাগানবাড়ি

চতুর্থ পর্ব

বিশ্বাসভাঙার পর মানুষ বাইরে থেকে যতটা ভাঙে, ভেতরে ভাঙে তার চেয়েও অনেক বেশি। কুদ্দুসের জীবনেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল। অনামিকার মুখেকখনো ভালোবাসিনিকথাটা শোনার পর থেকেই যেন তার পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল।

একসময় যে মানুষটা ফুলের গন্ধে সুখ খুঁজে পেত, সে এখন দিনের পর দিন নিজের ঘরে অন্ধকারে বসে থাকত। বাগানবাড়ির বারান্দায় আর চায়ের কাপ হাতে বসা হতো না তার। গোলাপগাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছিল, পুকুরের পানি ময়লা হয়ে উঠছিল, অথচ কুদ্দুসের সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না।

সে শুধু চুপচাপ থাকত।

অনেক সময় রাতভর জেগে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত। মনে হতো, তার চোখের ভেতর থেকে সমস্ত অনুভূতি হারিয়ে গেছে।

অনামিকা প্রথমদিকে কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করেছিল। কুদ্দুসের সেই নীরবতা তাকে ভয় পাইয়ে দিত। মাঝে মাঝে সে কথা বলতে চাইত।

—“খাবেন না?”

কুদ্দুস কোনো উত্তর দিত না।

—“এভাবে নিজেকে কষ্ট দেবেন না।

তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া থাকত না তার মধ্যে।

কুদ্দুস যেন ধীরে ধীরে বাস্তব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল।

একদিন সকালে বাড়ির কাজের লোক এসে দেখে, কুদ্দুস বাগানের ভেজা মাটির ওপর বসে আছে। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। তার কাপড় কাদা মাখা, চুল এলোমেলো। অথচ সে নির্বিকারভাবে শুকিয়ে যাওয়া গোলাপের দিকে তাকিয়ে আছে।

লোকটি কাছে গিয়ে বলল,
—“
স্যার, ঘরে চলুন।

কুদ্দুস ফিসফিস করে বলল,
—“
ফুলগুলোও মরে যায়তাই না?”

লোকটি কোনো উত্তর দিতে পারেনি।

এরপর থেকে কুদ্দুসের আচরণ আরও অস্বাভাবিক হতে থাকে।

সে কখনও মাঝরাতে একা একা হাসত, কখনও আবার হঠাৎ কান্না শুরু করত। গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, কুদ্দুস আর আগের মতো নেই।

একদিন বাজারে গিয়ে সে হঠাৎ এক অচেনা লোকের হাত ধরে বলেছিল,
—“
ভালোবাসা কি সত্যি জিনিস?”

লোকটি অবাক হয়ে হাত ছাড়িয়ে চলে যায়।

কুদ্দুস তখন নিজের মনেই বিড়বিড় করতে থাকে,
—“
মানুষ এত সহজে বদলে যায় কেন?”

ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে।

কারও কারও চোখে করুণা, কারও চোখে উপহাস।

অনামিকা তখন অনেকটাই দূরে সরে গেছে। সে এখন প্রায়ই বাইরে থাকে। মাঝে মাঝে মামুন গোপনে বাড়িতে আসত। কুদ্দুস এসব দেখত কি না, বোঝা যেত না।

কারণ, তার দৃষ্টি তখন সবসময় শূন্যে হারিয়ে থাকত।

একদিন রাতে অনামিকা সাহস করে বলেছিল,
—“
আপনি চাইলে চিকিৎসা করাতে পারেন।

কুদ্দুস ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায়।

সেই চোখে এমন এক শূন্যতা ছিল, যা দেখে অনামিকার বুক কেঁপে ওঠে।

কুদ্দুস মৃদু হেসে বলল,
—“
ভাঙা হৃদয়েরও চিকিৎসা হয়?”

অনামিকা চুপ করে যায়।

সত্যিই তোকিছু ক্ষত থাকে, যেগুলো কোনো ওষুধে সারে না।

দিনের পর দিন কুদ্দুস খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেয়। শরীর শুকিয়ে যায়। দাড়ি-চুল এলোমেলো হয়ে ওঠে। একসময় যে মানুষটা পরিচ্ছন্ন পোশাক ছাড়া বাইরে বের হতো না, সে এখন একই কাপড়ে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেয়।

বাগানবাড়িটাও যেন তার সঙ্গে সঙ্গে মরে যেতে থাকে।

যে বাড়ি একসময় হাসি আর স্বপ্নে ভরা ছিল, সেখানে এখন শুধু নিস্তব্ধতা।

এক রাতে কুদ্দুস হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

অনামিকা তখন ঘুমিয়ে ছিল।

ভোরে বাড়ির লোকেরা খুঁজে দেখে, কুদ্দুস কোথাও নেই।

সেদিন থেকে শুরু হয় তার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর জীবন।

প্রথম কয়েকদিন গ্রামের মানুষ তাকে বিভিন্ন জায়গায় দেখেছে। কখনও চায়ের দোকানে বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, কখনও রাস্তার পাশে বসে শুকনো পাউরুটি খাচ্ছে।

অনেকে তাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু কুদ্দুস ফিরতে চাইত না।

সে বলত,
—“
আমার বাড়ি নেই।

একদিন এক বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
—“
তোমার নাম কি বাবা?”

কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল,
—“
মানুষের নাম থাকেআমার নেই।

এই উত্তর শুনে বৃদ্ধের চোখ অন্ধকার হয়ে উঠেছিল।

কুদ্দুস ধীরে ধীরে নিজের পরিচয়ও ভুলে যেতে শুরু করে।

সে কখনও রাস্তার পাশে বসে ফুল কুড়াত, কখনও শিশুদের দেখে অকারণে হাসত।

আবার কখনও গভীর রাতে চিৎকার করে উঠত,
—“
আমি তো শুধু ভালোবেসেছিলাম!”

চারপাশের মানুষ ভয় পেত তাকে।

কেউ কেউ পাগল বলে পাথর ছুড়ে মারত।

কুদ্দুস পালাত না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকত।

যেন তার সমস্ত অনুভূতি অনেক আগেই মরে গেছে।

এদিকে অনামিকার জীবনেও শান্তি ছিল না।

সে চেষ্টা করছিল নতুনভাবে জীবন শুরু করতে। কিন্তু কুদ্দুসের সেই ভাঙা চোখ বারবার তার মনে পড়ে যেত।

মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে যেত তার।

মনে হতো, বাড়ির বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

একদিন সত্যিই গভীর রাতে সে দরজার বাইরে কুদ্দুসকে দেখতে পায়।

ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে আছে।

চোখ দুটো অদ্ভুত ফাঁকা।

অনামিকা কাঁপা গলায় বলল,
—“
আপনি এখানে কেন?”

কুদ্দুস শিশুর মতো সরল স্বরে বলল,
—“
আমার ফুলগুলো দেখতে এসেছি।

অনামিকার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।

সে প্রথমবার উপলব্ধি করে, একজন মানুষকে ভেঙে দেওয়া কত ভয়ংকর পাপ।

কুদ্দুস ধীরে ধীরে বাগানের দিকে এগিয়ে যায়।

শুকিয়ে যাওয়া গোলাপগাছের সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলে,
—“
দেখোসব মরে গেছে।

তারপর হঠাৎ হেসে ওঠে।

সেই হাসি ছিল ভয়ংকর।

অনামিকার মনে হয়, এই মানুষটা আর আগের কুদ্দুস নেই।

সে যেন নিজের ভেতর থেকেই হারিয়ে গেছে।

এরপর থেকে কুদ্দুসকে প্রায়ই শহরের রাস্তায় দেখা যেত।

কখনও ফুটপাথে ঘুমাচ্ছে, কখনও ডাস্টবিনের পাশে বসে আছে। মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে দিন কাটত তার।

একসময় যে মানুষটার ছিল বাড়ি-গাড়ি, সম্মান আর পরিচয়সে আজ পথের ভিখারির মতো বেঁচে আছে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছিল, কুদ্দুস নিজেও যেন আর এসব বুঝতে পারত না।

তার বাস্তববোধ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল।

একদিন কয়েকজন কিশোর তাকে ঘিরে হাসাহাসি করছিল।

—“পাগল! পাগল!”

কুদ্দুস হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“
পাগল আমি নাপাগল হলো ভালোবাসা।

ছেলেগুলো থমকে যায়।

কারণ, তার কণ্ঠে এমন এক কষ্ট ছিল, যা শুনে হাসতেও ভয় লাগে।

বর্ষার এক সন্ধ্যায় কুদ্দুস শহরের ব্যস্ত রাস্তার পাশে বসেছিল। বৃষ্টি পড়ছিল অবিরাম। তার হাতে ছিল একটি শুকনো গোলাপ।

সে ফুলটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলছিল,
—“
অনামিকা ফুল ভালোবাসত…”

পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ কেউ শুনছিল না।

এই পৃথিবীতে ভাঙা মানুষের গল্প শোনার সময় খুব কম মানুষেরই থাকে।

ধীরে ধীরে কুদ্দুস পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে ওঠে।

সে কখনও নিজের সঙ্গে কথা বলত, কখনও অকারণে কাঁদত।

কখনও আবার বাগানবাড়ির সামনে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত।

তার চোখে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরে বেড়াত
ভালোবাসা কি সত্যিই মিথ্যে?”

কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ ছিল না।

কারণ, মানুষ কুদ্দুসকে তখন আর মানুষ হিসেবে দেখত না।

সে হয়ে উঠেছিল রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এক পাগল।

এক হারিয়ে যাওয়া মানুষ।

যে একদিন বিশ্বাস করেছিল ভালোবাসা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

অথচ সেই ভালোবাসাই তাকে ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলনিজের পরিচয়, স্বপ্ন, সম্মান, এমনকি নিজের অস্তিত্ব থেকেও। চলবে.......