ঢাকা, শনিবার, ৯ মে ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৭:১৩ PM

দুঃসময়ের নির্ভরতার প্রতীক রুহুল কবির রিজভী

মান্নান মারুফ
09-05-2026 03:21:17 PM
দুঃসময়ের নির্ভরতার প্রতীক রুহুল কবির রিজভী

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু নেতা রয়েছেন, যাদের পরিচয় কেবল পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ এবং দুঃসময়ে দলের পাশে অবিচল উপস্থিতির মধ্য দিয়েই তারা নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন। রুহুল কবির রিজভী আহমেদ তেমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র কঠিন সময়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মুখ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছরের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মামলা, গ্রেপ্তার এবং দলীয় সংকটের মধ্যেও তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে কার্যত সচল রেখেছিলেন। রাজধানীর নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে যখন নীরবতা নেমে আসত, নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে থাকতেন কিংবা পুলিশের অভিযানের আতঙ্কে দূরে সরে যেতেন, তখনও রুহুল কবির রিজভী আহমেদ-কে সেখানে দেখা যেত। দলে অনেক দায়িত্বশীল নেতা থাকলেও সেই কঠিন বছরগুলোতে বিপদগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে সবচেয়ে বেশি যাকে পাওয়া গেছে, তিনি ছিলেন রুহুল কবির রিজভী। মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা কিংবা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় নেতাকর্মীদের সাহস জোগানো, দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং দলীয় কার্যালয়কে সচল রাখার ক্ষেত্রে তিনি নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংকটময় সময়ে তার এই ধারাবাহিক উপস্থিতিই তাকে বিএনপির “দুঃসময়ের নেতা” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি সরকার পরিচালনায় থাকলেও রিজভীর জীবনযাত্রা বা রাজনৈতিক কর্মধারায় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। তিনি এখনও নিয়মিত দলীয় কার্যালয়ে যান, সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকি করেন এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ বজায় রাখেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবেও গুরুত্বপুর্ন দায়িত্ব পালন করছেন। দলীয় সূত্র বলছে, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তিনি নিয়মিত শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করে চলেন।

রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে। রাজশাহী সরকারি কলেজে পড়াকালীন তিনি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-এ যোগ দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে তিনি সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও তার রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সেই স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। আন্দোলনের সময় গুলির আঘাতে আহত হওয়ার প্রভাবের কারণে তিনি এখনও মাঝেমধ্যে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। 

মূল ধারার রাজনীতিতে আসার পর ধীরে ধীরে তিনি সাংগঠনিক দক্ষতা, মাঠকেন্দ্রিক নেতৃত্ব এবং দলীয় আনুগত্যের কারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন তিনি। বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো “সবসময় দৃশ্যমান থাকা”। দলীয় সংকটের মুহূর্তে সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি, আন্দোলনের ঘোষণা কিংবা নেতাকর্মীদের সাহস জোগানোর ক্ষেত্রে তাকে সামনের সারিতেই দেখা গেছে।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে ঘিরে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান থাকত, তখনও রিজভী কার্যালয় ছেড়ে যাননি। অনেক সময় পুলিশের অভিযানের আশঙ্কা জেনেও তিনি কার্যালয়ে অবস্থান করতেন। ফলে একাধিকবার তাকে গ্রেপ্তার, হেনস্তা কিংবা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে এ কারণেই তাকে “পরিক্ষিত নেতা” বলে আখ্যা দেওয়া হয়। 

২০২৩ সালের রাজনৈতিক উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে সংঘর্ষ ও সহিংসতার পর দলীয় শীর্ষ নেতাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হন। সে সময় রিজভী আত্মগোপনে থেকেও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নেতাকর্মীদের আন্দোলনের নির্দেশনা দেন। সরকারের পতনের দাবিতে তার ধারাবাহিক বক্তব্য তখন বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। যদিও ক্ষমতাসীন  আওয়ামীলীগ নেতারা এসব কর্মকাণ্ডকে কটাক্ষ করেছিলেন, তবু রিজভী তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রিজভীর সবচেয়ে বড় শক্তি তার সাংগঠনিক উপস্থিতি এবং কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ের ছোট্ট একটি কক্ষই যেন তার রাজনৈতিক জীবনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেখানে একটি সাধারণ খাট, কিছু ফাইলপত্র এবং সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্য দিয়েই কেটেছে তার দীর্ঘ সময়। নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলা, হামলা কিংবা সাংগঠনিক সংকটে যে কেউ নয়াপল্টনে গেলে রিজভীকে পাওয়া যেত।

বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা মনে করেন, রিজভী কেবল একজন মুখপাত্র নন; তিনি কর্মীদের জন্য সাহস ও আস্থার প্রতীক। কেন্দ্রীয় মহিলা দলের নেত্রী এলিজা শারমিন মুন্নি বলেন, রিজভী দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের “ঢাল” হয়ে আগলে রেখেছেন। একইভাবে ছাত্রদল ও কৃষকদলের নেতারাও মনে করেন, রিজভীর রাজনৈতিক জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের উদাহরণ।

তবে সমালোচনাও নেই, এমন নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনের কেউ কেউ মনে করেন, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতার মূল ভিত্তি হলো দীর্ঘদিনের ত্যাগ এবং কঠিন সময়ে মাঠে সক্রিয় থাকা।

বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি তার নিঃশর্ত আনুগত্যও তাকে দলীয়ভাবে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। নেতৃত্ব সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা কিংবা আন্দোলনের ব্যর্থতার সময়েও তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশে থেকে দলকে সংগঠিত রাখার চেষ্টা করেছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নেতার সংখ্যা খুব বেশি নয়, যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলীয় কাঠামো সচল রাখতে ভূমিকা রাখেন। রুহুল কবির রিজভী সেই বিরল রাজনীতিকদের একজন, যিনি হয়তো সবচেয়ে জনপ্রিয় জননেতা নন, কিন্তু দলের কঠিন সময়ে সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং নির্ভরযোগ্য মুখ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

রাজপথ, নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, সংবাদ সম্মেলন, গ্রেপ্তার, কারাবরণ এবং দলীয় আনুগত্য—এই কয়েকটি শব্দেই সংক্ষেপে তুলে ধরা যায় রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবন। বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই ত্যাগ ও সংগ্রামের যথাযথ মূল্যায়ন দল ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে করবে।