গ্রীষ্মকালীন ফলের পুরো মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে দেখা মিলছে আম ও লিচুর। দোকানজুড়ে টকটকে হলুদ আম আর লালচে লিচু দেখে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনপ্রিয় এই দুই গ্রীষ্মকালীন ফলের মৌসুম এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। ফলে বর্তমানে বাজারে থাকা অধিকাংশ আম ও লিচুই অপরিপক্ব। এতে একদিকে ক্রেতারা উচ্চমূল্যে নিম্নমানের ফল কিনে প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।
প্রশাসনের প্রকাশিত ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী, এ সময় বাজারে মূলত সাতক্ষীরার কিছু স্থানীয় জাতের আম থাকার কথা। কিন্তু ঢাকার বাজারে ইতোমধ্যে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও অন্যান্য উন্নত জাতের আম বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব আমের বড় একটি অংশ অপরিপক্ব অবস্থায় গাছ থেকে নামিয়ে রাসায়নিক ব্যবহার করে পাকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে।
লিচুর মৌসুমও এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। বিশেষ করে দিনাজপুর ও পাবনার লিচু বাজারে আসতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। অথচ এর আগেই বিভিন্ন জাতের লিচু বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যার বেশির ভাগই অপরিপক্ব বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, নয়াবাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, মে মাসের শুরু থেকেই গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া ও গোলাপখাসসহ বিভিন্ন জাতের আম বিক্রি হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী দাবি করছেন, এসব আম রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসেছে। তবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ওই অঞ্চলের অধিকাংশ আম এখনো পরিপক্ব হয়নি।
বাজারে এখন থাকার কথা সাতক্ষীরার আম
চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ৫ মে থেকে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, বৈশাখী ও বোম্বাই জাতের আম সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছে। একই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৫ মে থেকে হিমসাগর ও খিরসা, ২৭ মে থেকে ল্যাংড়া এবং ৫ জুন থেকে আম্রপালি সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার আম ব্যবসায়ী ইয়াহিয়া হাসান জানান, এ বছর জেলায় আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ৫ মে থেকে বাজারে আম সরবরাহ শুরু হয়েছে। বর্তমানে মূলত গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ জাতের আম সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে গোবিন্দভোগের উৎপাদন তুলনামূলক বেশি। প্রতিদিন সাতক্ষীরা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম পাঠানো হচ্ছে।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের বাজার এখন অপরিপক্ব আমে সয়লাব। এতে সাতক্ষীরার আসল আমের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মৌসুমের শুরুতে বাজারে মূলত সাতক্ষীরার আম থাকার কথা থাকলেও বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঁচা আম সংগ্রহ করে রাসায়নিক দিয়ে পাকিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এতে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসনের ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, গোপালভোগ আম বাজারে আসার নির্ধারিত সময় ২২ মে, হিমসাগর বা ক্ষিরসাপাত ৩০ মে এবং ল্যাংড়া ১০ জুন। নওগাঁয় গোপালভোগ সংগ্রহের অনুমতি ৩০ মে, হিমসাগর ২ জুন এবং ল্যাংড়া ১০ জুন থেকে দেওয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় হিমসাগর সংগ্রহ শুরু হবে ২০ মে এবং ল্যাংড়া ২৫ মে থেকে।
এ অবস্থায় রাজধানীর বাজারে আগেভাগেই এসব জাতের আমের উপস্থিতি নিয়ে ভোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
‘বাইরে পাকা, ভেতরে কাঁচা’
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, “দেখতে সুন্দর লাগায় পরিবারের জন্য আম কিনেছিলাম। বাসায় কেটে দেখি ভেতরে কাঁচা। রাতে বাচ্চার পেটব্যথা শুরু হয়। পরে বুঝলাম আমগুলো স্বাভাবিকভাবে পাকেনি।”
পল্টন এলাকার এক ক্রেতা বলেন, “জানতাম এখনকার আম খুব ভালো হওয়ার কথা না, তারপরও লোভ সামলাতে পারিনি। কেজি প্রতি ২৫০ টাকা দিয়েও ভালো আম পাইনি।”
বর্তমানে খুচরা বাজারে আগাম আম ১৯০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে লিচুর প্রতি ছড়া বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৯০০ টাকায়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতেই বেশি লাভের আশায় একশ্রেণির ব্যবসায়ী অপরিপক্ব ফল সংগ্রহ করছেন। পরে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে দ্রুত পাকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে।
গত ২৯ এপ্রিল সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ রাসায়নিক ও কার্বাইড দিয়ে পাকানো প্রায় ৯ হাজার কেজি অপরিপক্ব আম জব্দ করে। চট্টগ্রামগামী একটি ট্রাক থেকে ৩৫১ ক্যারেট আম উদ্ধার করা হয়, যেগুলোতে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ফলের নির্দিষ্ট পরিপক্বতার সময় রয়েছে। সময়ের আগে ফল সংগ্রহ করলে ভেতরে স্বাভাবিক শাঁস তৈরি হয় না। ফলে বাইরে থেকে পাকা দেখালেও ফলের গুণগত মান ও পুষ্টিগুণ ঠিক থাকে না।
বিশেষজ্ঞরা অতিরিক্ত চকচকে, অস্বাভাবিক উজ্জ্বল বা গন্ধহীন ফল কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ফল খাওয়ার আগে কিছু সময় পানিতে ভিজিয়ে রেখে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে অপরিপক্ব ও রাসায়নিকযুক্ত ফলের বিস্তার বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য চাষি, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সব পক্ষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কবার্তা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামসুল আমিন বলেন, কিছু ব্যবসায়ী বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে অপরিপক্ব ফল পাকাচ্ছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর মতে, এসব ফল খেলে প্রথমদিকে বমি ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনির ক্ষতির পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, অপরিপক্ব লিচু বিশেষ করে শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। খালি পেটে এসব লিচু খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে গিয়ে মস্তিষ্কে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফল নিশ্চিত করতে আমচাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে চাষিদের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, অপরিপক্ব ফল বাজারজাত করা বা ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে নিরাপদ ফল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি চালানো হচ্ছে।
সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, মৌসুমি ফল বাজারে আসার আগেই একটি অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। দ্রুত লাভের আশায় তারা অপরিপক্ব ফল বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে বাজারজাত করে। বাইরে থেকে ফলগুলো আকর্ষণীয় ও পাকা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সেগুলো খাওয়ার উপযোগী হয় না।
তিনি বলেন, অতীতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক মেশানো ফল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাই শুধু অভিযান নয়, বাজার তদারকি জোরদারের পাশাপাশি ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।