ঢাকা, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬,
সময়: ১১:৩২:৩৪ PM

একনেকে ৩৩৪৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
13-05-2026 09:45:15 PM
একনেকে ৩৩৪৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন

দীর্ঘদিনের বিলম্ব ও একাধিক ধাপ পেরিয়ে অবশেষে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে নেওয়া এই বৃহৎ প্রকল্পটি বুধবার (১৩ মে) অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়।বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। এটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত।

শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, এটি খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের মোট ১৯টি জেলায় বাস্তবায়িত হবে। এর আওতায় পুনরুজ্জীবিত করা হবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী ব্যবস্থা, যার মধ্যে রয়েছে—

  • হিসনা–মাথাভাঙ্গা নদী ব্যবস্থা
  • গড়াই–মধুমতি নদী ব্যবস্থা
  • চন্দনা–বারাশিয়া নদী ব্যবস্থা
  • বড়াল নদী
  • ইছামতি নদী

দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনা সংকট নিরসনের উদ্যোগ

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পদ্মা ব্যারাজ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পদ্মা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি, মৎস্য, নৌ-পরিবহন, বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে—

  • সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে লবণাক্ততার আগ্রাসন কমবে,
  • সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত হবে,
  • ভৈরবদহসহ জলাবদ্ধ এলাকায় ড্রেজিং ও উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হবে।

প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য

প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো—

  • পাঁচটি প্রধান নদী ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা,
  • সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার,
  • ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বৃদ্ধি,
  • আর্সেনিক দূষণ হ্রাস,
  • সেচ সুবিধার উন্নয়ন,
  • ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

অবকাঠামোগত প্রধান উপাদান

প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে—

  • ৭৮টি স্লুইস গেট,
  • ১৮টি আন্ডার স্লুইস,
  • মাছ চলাচলের বিশেষ পথ (ফিশ পাস),
  • নৌ-লক,
  • গাইড বাঁধ,
  • সংযোগ বাঁধ।

এছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীতে অফ-টেক কাঠামো, স্পিলওয়ে এবং নৌ ও মাছ চলাচলের সুবিধাও নির্মাণ করা হবে।

জলবিদ্যুৎ উৎপাদন

প্রকল্পের অংশ হিসেবে দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যেগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১১৩ মেগাওয়াট।

  • মূল ব্যারাজের পাশে ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কেন্দ্র,
  • গড়াই অফ-টেক পয়েন্টে ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

নদী পুনরুদ্ধার ও বন্যা ব্যবস্থাপনা

প্রকল্পের আওতায়—

  • গড়াই–মধুমতি নদী ব্যবস্থায় ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং,
  • হিসনা নদী ব্যবস্থায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন,
  • পানি নিয়ন্ত্রণ ও বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য অতিরিক্ত ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফলাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

কৌশলগত গুরুত্ব

প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, পদ্মানির্ভর অঞ্চলগুলো বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৩৭ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং এখানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাস করে।

সরকারের মতে, ১৯৭০-এর দশকে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে পদ্মা নদীর শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ ক্রমাগত কমে এসেছে। এর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বহু শাখা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে—

  • কৃষি উৎপাদন কমেছে,
  • মৎস্যসম্পদ হ্রাস পেয়েছে,
  • পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে,
  • উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বেড়েছে।

এছাড়া মিঠাপানির সংকট সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, ব্যারাজের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ করা গেলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়বে। এর ফলে প্রধান নদী নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত হবে এবং সেচ, নিষ্কাশন ও বন্যা সহনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি পর্যালোচনা করা হয়। পরবর্তীতে কমিশন সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করে।

সূত্র: ইউএনবি (UNB)।