ঢাকা, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬,
সময়: ১১:৩৪:২২ PM

”নিহারিকা”

মান্নান মারুফ
13-05-2026 12:39:23 PM
”নিহারিকা”

পর্ব- ১
“ভালোবাসা দেখা বা রোজ কথা বলা না। ভালোবাসা হচ্ছে সব সময় অন্তরে থাকা যে নাম বা মানুষটি।”
কুদ্দুস তখনও ভালোবাসা শব্দটার ভেতরের গভীরতা বুঝত না। তার কাছে জীবন মানে ছিল বইয়ের গন্ধ, বিকেলের নির্জনতা আর নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশ দেখা। ছোট্ট শহর কালীগঞ্জে তার জীবন খুব সাধারণভাবেই কাটছিল। সকালে কলেজ, বিকেলে পুরোনো লাইব্রেরি, আর রাতে টেবিল ল্যাম্পের নিচে বই।
শহরের একেবারে শেষ মাথায় “জনতা পাঠাগার” নামে পুরোনো একটি লাইব্রেরি ছিল। লাল ইটের দেয়ালে সময়ের দাগ জমে ছিল, জানালার কাঠগুলো বৃষ্টিতে ফুলে উঠেছিল। ভেতরে ঢুকলেই পুরোনো কাগজের গন্ধে বুক ভরে যেত। কুদ্দুসের পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল সেটি।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সে বিকেলে লাইব্রেরিতে গিয়েছিল। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। টিনের চালের উপর টুপটাপ শব্দ পড়ছিল একটানা। লাইব্রেরির কোণের টেবিলটায় বসে সে জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই খুলেছিল।
ঠিক তখনই দরজার ঘণ্টাটা হালকা শব্দ করে উঠল।
কুদ্দুস মুখ তুলে তাকাল।
একটি মেয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকছে। সাদা-নীল সালোয়ার কামিজ, ভেজা চুলের ডগা থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। মেয়েটার হাতে কয়েকটি বই। চোখ দুটো কেমন যেন অদ্ভুত শান্ত, অথচ গভীর।
মেয়েটি ভেতরে এসে চারদিকে তাকাল, যেন কাউকে খুঁজছে। তারপর লাইব্রেরিয়ানকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— “কবিতার বইগুলো কোন পাশে?”
কুদ্দুস জানত না কেন, কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর শুনে তার বুকের ভেতরটা কেমন ধীরে কেঁপে উঠল।
লাইব্রেরিয়ান হাত তুলে ডান পাশের তাক দেখিয়ে দিলেন। মেয়েটি সেদিকে চলে গেল।
কুদ্দুস আবার বইয়ের পাতায় চোখ নামালেও মন আর সেখানে রইল না। অদ্ভুতভাবে বারবার তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল ওই মেয়েটির দিকে। মেয়েটি খুব মন দিয়ে বই দেখছিল। মাঝে মাঝে কোনো বই খুলে দু-এক লাইন পড়ছিল, আবার রেখে দিচ্ছিল।
হঠাৎ একটি বই তাক থেকে পড়ে গেল।
কুদ্দুস দ্রুত উঠে গিয়ে বইটা তুলে নিল।
মেয়েটিও নিচু হয়েছিল। দু’জনের হাত একসঙ্গে বইয়ের মলাট ছুঁয়ে গেল।
এক মুহূর্ত।
খুব ছোট্ট একটা মুহূর্ত।
তবুও সেই মুহূর্তে কুদ্দুসের মনে হলো, সময় যেন একটু থেমে গেছে।
মেয়েটি চোখ তুলে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “ধন্যবাদ।”
কুদ্দুস হঠাৎ কী বলবে বুঝতে পারল না। শুধু মাথা নেড়ে বইটা এগিয়ে দিল।
বইটির নাম ছিল— “রূপসী বাংলা”।
মেয়েটি বইটা হাতে নিয়ে আবার হাসল।
— “আপনিও কি কবিতা পড়েন?”
কুদ্দুস একটু ইতস্তত করে বলল,
— “হ্যাৃঁ মাঝে মাঝে।”
মেয়েটি বলল,
— “মাঝে মাঝে পড়া মানুষরা আসলে সবচেয়ে বেশি অনুভব করে।”
কথাটা বলে সে অন্যদিকে চলে গেল।
কুদ্দুস অনেকক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
সেদিন আর পড়াশোনা হয়নি তার। শুধু মনে হচ্ছিল, লাইব্রেরির ভেতর কোথাও যেন নরম একটা আলো ছড়িয়ে আছে।
বের হওয়ার সময় লাইব্রেরিয়ান বললেন,
— “নতুন মেয়ে। নাম নিহারিকা। পাশের বাসায় এসেছে।”
নিহারিকা।
নামটা শুনেই কুদ্দুসের মনে হলো, এই নামের ভেতর নিশ্চয়ই অনেক আকাশ লুকিয়ে আছে।
সেদিন রাতে কুদ্দুস বই খুলে বসেছিল ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি পাতার ফাঁকে সে শুধু একজোড়া শান্ত চোখ দেখতে পাচ্ছিল।
জানালার বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল।
আর তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষের আগমন হয় খুব নীরবে। তারা হঠাৎ করেই জীবনের ভেতর ঢুকে পড়ে, অথচ কোনো শব্দ হয় না।

তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই লাইব্রেরিতে দেখা হতে লাগল তাদের।
খুব বেশি কথা হতো না। কখনো বই নিয়ে দু-একটা আলোচনা, কখনো কবিতার লাইন নিয়ে ছোট্ট তর্ক। কিন্তু সেই অল্প কথার মাঝেও কেমন এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল।
নিহারিকা কথা বলত ধীরে ধীরে। তার কণ্ঠে এক ধরনের কোমলতা ছিল। সে রবীন্দ্রনাথ ভালোবাসত, জসীমউদ্দীন পড়তে পড়তে কাঁদত, আর বৃষ্টির দিনে কবিতা আবৃত্তি করতে পছন্দ করত।
কুদ্দুস শুধু শুনত।
তার ভালো লাগত শুনতে।
একদিন বিকেলে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। পুরো লাইব্রেরি অন্ধকার হয়ে ছিল। জানালা দিয়ে আসা শেষ বিকেলের আলোয় নিহারিকা বই পড়ছিল।
কুদ্দুস তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ নিহারিকা বলল,
— “এভাবে কী দেখছেন?”
কুদ্দুস চমকে উঠল।
— “নাৃ কিছু না।”
নিহারিকা মৃদু হেসে বলল,
— “আপনি খুব কম কথা বলেন।”
— “সব কথা বলা যায় না।”
— “তাহলে?”
কুদ্দুস একটু চুপ থেকে বলল,
— “কিছু কথা শুধু মনে থাকে।”
নিহারিকা উত্তর দিল না। শুধু জানালার বাইরে তাকাল।
সেদিন বাইরে কদম ফুল ফুটেছিল।

ধীরে ধীরে কুদ্দুস বুঝতে পারল, তার প্রতিদিনের অপেক্ষার নাম এখন নিহারিকা।
সে লাইব্রেরিতে যায় বই পড়তে নয়, বরং মেয়েটিকে একবার দেখার জন্য।
অথচ কোনোদিন সে ভালোবাসার কথা বলেনি। বলার সাহসও হয়নি।
কারণ কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো শব্দে বললে ছোট হয়ে যায়।
নিহারিকাও বুঝত হয়তো। তাই সে কখনো জানতে চায়নি।
তাদের সম্পর্কটা ছিল নদীর জলের মতো—নিঃশব্দ, ধীর, অথচ গভীর।
একদিন বিকেলে নিহারিকা হঠাৎ বলল,
— “আপনি কি কখনো কাউকে খুব বেশি মনে রেখেছেন?”
কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— “হয়তো।”
— “কেমন লাগে তখন?”
কুদ্দুস জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “মনে হয়, মানুষটা কাছে না থাকলেও কোথাও খুব ভেতরে থাকে।”
নিহারিকা আর কিছু বলল না।
শুধু তার চোখ দুটো কেমন যেন হয়ে উঠল।

সেদিন ছিল শরতের শেষ বিকেল। আকাশে সাদা মেঘ ভাসছিল।
লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার আগে নিহারিকা একটি বই ফেরত দিচ্ছিল। কুদ্দুস দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ বইয়ের ভেতর থেকে ছোট্ট একটি কাগজ মাটিতে পড়ে গেল।
কুদ্দুস কাগজটা তুলে নিল।
নিহারিকা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— “ওটা দিন।”
কিন্তু কুদ্দুসের চোখ ততক্ষণে লেখাটার উপর পড়ে গেছে।
সুন্দর হাতের লেখায় লেখা—
“কিছু মানুষ কথা না বলেও মনে থেকে যায়।”
কুদ্দুস ধীরে ধীরে কাগজটা এগিয়ে দিল।
নিহারিকা কাগজটা নিয়ে বইয়ের ভেতর রেখে দিল। তারপর একবার তার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে কোনো স্বীকারোক্তি ছিল না।
কিন্তু ছিল এক গভীর নীরবতা।
যে নীরবতা শব্দের চেয়েও বেশি সত্য।
লাইব্রেরির বাইরে তখন বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসছিল।
আর কুদ্দুস প্রথমবার অনুভব করল—কারও নাম যখন অন্তরে জন্ম নেয়, তখন পৃথিবীর সবকিছু আগের মতো থাকলেও মানুষ আর আগের মতো থাকে না।

চলবে...........