প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার ও নিশ্ছিদ্র করতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে ‘চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান’-পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে সচিবালয়ের নিরাপত্তা কাঠামো ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগে সচিবালয়ে পদায়ন পাওয়া সব পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের স্থলে পর্যায়ক্রমে নতুন, দক্ষ ও চৌকষ পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নিয়মিতভাবে সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে অফিস করছেন। ফলে দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে সচিবালয়ের নিরাপত্তা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের দুর্বলতা রাখা যাবে না বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সচিবালয়ের বিভিন্ন গেট, গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দফতর এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের গানম্যান হিসেবে বর্তমানে যেসব পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মধ্যে যারা ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগে এখানে পদায়ন পেয়েছেন, তাদের সবাইকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে শূন্য হওয়া পদগুলোতে সমানসংখ্যক নতুন সদস্য নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সচিবালয়ে বর্তমানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ১৬৯ জনের একটি তালিকাও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে নতুন সদস্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, নতুনভাবে পদায়নের ক্ষেত্রে কেবল দক্ষতা নয়, সদস্যদের পেশাগত সততা, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংবেদনশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নতুনভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ‘সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স’ বা নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের অতীত কর্মকাণ্ড, পেশাগত রেকর্ড, ব্যক্তিগত আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করেই চূড়ান্তভাবে পদায়ন দেওয়া হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব পালনের জন্য সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বসম্পন্ন সদস্য নিয়োগ অপরিহার্য।
প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ সচিবালয় দেশের নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান স্থান। প্রতিদিন এখানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশি প্রতিনিধি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যাতায়াত করেন। ফলে সচিবালয়ের নিরাপত্তা শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোতে আরও আধুনিক ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
এদিকে সচিবালয়ের নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে শুধু জনবল পরিবর্তনই নয়, নজরদারি ব্যবস্থাও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রবেশপথে তল্লাশি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, সিসিটিভি মনিটরিং বৃদ্ধি, ডিজিটাল অ্যাক্সেস কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হবে।
সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের এই নতুন উদ্যোগ প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি ছিল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত ও আধুনিক করা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এ বিষয়ে সরকারিভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় হওয়ায় অনেক তথ্য প্রকাশ্যে আনা সম্ভব নয়। তবুও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রকে ঘিরে সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট যে, সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইছে না সরকার।