রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। দিনের পাশাপাশি রাত ও ভোরের নির্জন সময়কে টার্গেট করে এসব চক্র ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পথচারীদের কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিচ্ছে বলে একাধিক ঘটনায় জানা গেছে। গত ১৩ মে দুপুরে শেরেবাংলা নগর থানার শিশুমেলার সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন একটি অনলাইন পোর্টালের ঢাকা মেডিকেল প্রতিবেদক কাজী আল-আমিন। বিআরটিসি বাসে ওঠার পর সংঘবদ্ধ একটি দল তার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। ভুক্তভোগীর দাবি, ব্যাগে নগদ টাকা, স্মার্টফোন, ব্যাংক কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিল। তিনি ধারণা করছেন, ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা তোলার পর থেকেই তাকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাফিক পুলিশের সহায়তা পেলেও সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশের সহায়তা প্রত্যাশিত মাত্রায় পাননি। এই ঘটনার পর রাজধানীতে ছিনতাই আতঙ্ক নতুন করে আলোচনায় আসে।
এর আগে ১১ মে মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় দিনের বেলায় চলন্ত রিকশা থামিয়ে এক কলেজ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে চাপাতি ঠেকিয়ে মোবাইল ফোন, ইয়ারবাড ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক দ্রুত গতিতে এসে অস্ত্রের মুখে সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যায়।
ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ করে, অস্ত্রের মুখে ছিনতাই হলেও থানায় মামলা গ্রহণ করা হয়নি; শুধুমাত্র জিডি নেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভুক্তভোগীর বাবা।
একই ধরনের ঘটনা ১ মে আগারগাঁও, মালিবাগ রেলগেট ও শাহবাগ এলাকায়ও ঘটে। আগারগাঁওয়ে গৃহবধূ শিল্পী বেগম চিকিৎসার টাকা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হন এবং ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে টাকা ও মোবাইল হারান। মালিবাগে পোশাকশ্রমিকদের ওপর হামলার পাশাপাশি শাহবাগ এলাকায় দম্পতির কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের মধ্যে পেশাদার সংঘবদ্ধ চক্র, মাদকাসক্ত অপরাধী এবং তরুণদের একটি অংশ সক্রিয় রয়েছে। তারা সাধারণত চার থেকে পাঁচ সদস্যের দলে বিভক্ত হয়ে নির্জন সড়ক, বাসস্ট্যান্ড ও রেলগেট এলাকায় অবস্থান নেয় এবং সুযোগ বুঝে হামলা চালায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে প্রায় ১২০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারের পর অনেকেই জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, মোট ছিনতাইয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সংঘটিত হচ্ছে।
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছিনতাই সংক্রান্ত ৩০৮টি অভিযোগ জমা পড়ে। তবে বাস্তবে ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি, কারণ অনেক ভুক্তভোগী মামলা না করে শুধু জিডি করেন বা থানায়ই যান না।
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং চিহ্নিত অপরাধীদের তালিকা ধরে অভিযান চালানো হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে ছিনতাই এখন পেশাভিত্তিক সংঘবদ্ধ অপরাধে রূপ নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, গভীর রাত, ভোর ও সন্ধ্যার সময় পর্যাপ্ত টহলের অভাব থাকায় অপরাধীরা সহজে সুযোগ পাচ্ছে। গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়ানোর প্রবণতাও উদ্বেগজনক।
তিনি আরও বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে শুধু পুলিশি অভিযান নয়, সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ এবং কার্যকর কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত এসব ছিনতাই নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বেকারত্ব, মাদকাসক্তি ও অপরাধচক্রের বিস্তার এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সার্বিকভাবে রাজধানীতে সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্রের তৎপরতা নাগরিক জীবনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।