পঞ্চম পর্ব
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মান্নান আকনের শেষ কথাটা তার ভেতরের কোথাও একটা ভারী পাথরের মতো বসে গেছে—“চাকরি বাঁচাতে গিয়ে যদি বিবেকটাই মরে যায়, তাহলে বেঁচে থেকে লাভ কী?”
প্রেসক্লাবের পুরোনো দেয়াল, ঝুলে থাকা সাদাকালো ছবিগুলো, আর ভেতরের অস্থির মানুষগুলোর শব্দ—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন আর সাংবাদিকতার কেন্দ্র না, বরং এক ধরনের ক্লান্ত বাজার। যেখানে সত্যও বিক্রি হয়, আর নীরবতাও।
রাশেদ ধীরে ধীরে বারান্দায় ফিরে এলো। শহরের রাত তখন আরও গভীর। দূরের রাস্তায় হেডলাইটের আলো ছুটে যাচ্ছে, যেন কেউ কারও দিকে না তাকিয়েই পালিয়ে যাচ্ছে।
তার ফোন আবার কেঁপে উঠল।
নীরা।
এইবার রাশেদ আর দেরি করল না।
— “হ্যালো।”
ওপাশ থেকে নীরা খুব শান্ত গলায় বলল—
— “তুমি এখনও ওখানেই?”
— “হ্যাঁ।”
— “তুমি বুঝতে পারছ না রাশেদ, এই জায়গাটা তোমাকে গিলে ফেলবে।”
রাশেদ একটু হেসে ফেলল।
— “আমাকে গিলে ফেলতে হলে জায়গাটার আগে নিজের অস্তিত্ব থাকতে হয় নীরা।”
নীরা চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল—
— “তুমি আগের মতো নেই।”
এই কথাটা রাশেদের বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে লাগল। সে চুপ হয়ে গেল।
কিছু মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর নীরা আবার বলল—
— “আমার বাবা আজ খুব ভেঙে পড়েছেন। শুধু একটা তালিকার কারণে একজন মানুষ সারাজীবনের অর্জন হারিয়ে ফেলতে পারে—এটা তুমি বিশ্বাস করো?”
রাশেদ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল—
— “আমি এখন আর কিছুতেই অবাক হই না।”
ফোনটা কেটে গেল।
রাশেদ কিছুক্ষণ ফোন হাতে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, এই শহরে সম্পর্কগুলোও এখন এক ধরনের চাপা ক্লান্তি বহন করে। ভালোবাসাও যেন এখন ব্যাখ্যার অপেক্ষায় থাকে, অনুভূতির না।
পরদিন সকাল।
ঢাকার আকাশ ধোঁয়াটে। প্রেসক্লাবের সামনে ছোট ছোট জটলা। কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ হতাশ, কেউ আবার হিসাব কষছে—কার পাশে দাঁড়ালে ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে।
রাশেদ ভেতরে ঢুকতেই জসিমের মুখোমুখি হলো।
জসিম হাসতে হাসতে বলল—
— “ভাই, আপডেট রাখছেন তো? আজকে আবার মিটিং আছে। তালিকা নিয়ে নাকি ঝামেলা আরও বাড়বে।”
রাশেদ তাকে এড়িয়ে গেল।
তার চোখে শুধু একটা দৃশ্য ভাসছে—মান্নান আকনের কাগজে লেখা হাতের কম্পন।
ভেতরে ঢুকতেই ক্যান্টিনের কোণায় কুদ্দুসকে দেখা গেল। চুপচাপ বসে আছে। তার সামনে ঠান্ডা চা।
রাশেদ কাছে গিয়ে বসল।
— “তুমি এভাবে চুপ করে থাকো কীভাবে কুদ্দুস ভাই?”
কুদ্দুস মৃদু হেসে বলল—
— “চুপ থাকা শিখতে হয় না রাশেদ। মানুষকে শেখানো হয় কথা বললে কী হারায়।”
রাশেদ কিছু বলল না।
কুদ্দুস একটু ঝুঁকে বলল—
— “এই তালিকা আসলে শুধু নামের না। এটা ক্ষমতার খেলা। কে থাকবে, কে বাদ যাবে—এই সিদ্ধান্তই এখন সাংবাদিকতার সংজ্ঞা হয়ে গেছে।”
রাশেদ মাথা নিচু করল।
হঠাৎ কুদ্দুস বলল—
— “চাঁদাবাজ জাহাঙ্গীরকে চিনিস?”
রাশেদ তাকাল।
— “চিনব না কেন?”
কুদ্দুসের চোখে একটা তীক্ষ্ণতা এলো।
— “এই লোকটাই এখন বড় মিডিয়া হাউজের ‘বিজনেস অ্যাডভাইজার’। আগে যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দোকান থেকে টাকা তুলত, এখন সে টেবিলে বসে নীতির কথা বলে।”
রাশেদ মৃদু স্বরে বলল—
— “এটাই তো সমস্যা। নোংরা মানুষগুলো সময়ের সাথে ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়।”
কুদ্দুস হেসে ফেলল।
— “না রাশেদ। তারা পরিষ্কার হয় না। আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাই।”
দুপুরের দিকে প্রেসক্লাবে আবার মিটিং শুরু হলো।
বড় হল ভর্তি মানুষ। সভাপতি মঞ্চে উঠলেন।
সেই একই মানুষ—রশীদ সাহেব।
তার গলায় আগের মতোই দৃঢ়তা, কিন্তু চোখে একটা অদৃশ্য চাপা অস্থিরতা।
— “প্রেসক্লাবের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে,” তিনি বললেন। “আমরা যোগ্যতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
হলের একপাশে কেউ একজন চিৎকার করে উঠল—
— “যোগ্যতা? নাকি লবিং?”
আরেকজন বলল—
— “আপনারা সাংবাদিকতাকে ব্যবসায় পরিণত করেছেন!”
মুহূর্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
রাশেদ দাঁড়িয়ে ছিল পেছনে।
তার মনে হচ্ছিল, এই শব্দগুলো আর বিতর্ক না—এগুলো একটা ভেঙে পড়া পেশার আর্তনাদ।
মিটিং শেষ না করেই অনেকে বেরিয়ে গেল।
বিকেলের দিকে রাশেদ একা বাইরে বের হলো।
প্রেসক্লাবের সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছটা আজও দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ তার মনে পড়ল নীরার কথা।
সে ফোন করল।
নীরা ধরল।
— “তুমি কোথায়?”
— “প্রেসক্লাবের সামনে।”
— “তুমি কি সত্যিই এই জায়গা ছাড়তে পারো না রাশেদ?”
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— “ছাড়তে পারা আর ছেড়ে যাওয়া এক জিনিস না নীরা।”
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “তুমি যদি এখানে থেকে যাও, তুমি হারিয়ে যাবে।”
রাশেদ আকাশের দিকে তাকাল।
— “হয়তো হারিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো সত্যিকারের পথ নেই।”
সন্ধ্যার আগে রাশেদ কুদ্দুসের সঙ্গে দেখা করল।
কুদ্দুস তাকে নিয়ে গেল পুরোনো একটা চায়ের দোকানে।
দোকানটার দেয়াল ভাঙা, কিন্তু মানুষ কম না।
কুদ্দুস ধীরে বলল—
— “এই শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা জানিস কী?”
রাশেদ তাকাল।
— “কি?”
— “এখানে মানুষ অন্যায় দেখে রাগ করে, কিন্তু অভ্যস্ত হয়ে যায়।”
রাশেদ চুপ।
কুদ্দুস আবার বলল—
— “আরেকটা সমস্যা আছে। ভালো মানুষরা চুপ হয়ে যায়, খারাপ মানুষরা সংগঠিত হয়।”
রাশেদ মাথা নিচু করল।
তার মনে হলো, এই শহরে সে নিজেও কোথাও মাঝামাঝি অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে—না পুরোপুরি প্রতিবাদী, না পুরোপুরি নীরব।
রাত নামল।
প্রেসক্লাবের ভেতরে শেষ আলোগুলো নিভে যাচ্ছে।
রাশেদ একা দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়।
তার সামনে শহর—জীবন্ত, অস্থির, নির্লজ্জ।
হঠাৎ নীরা আবার ফোন করল।
— “রাশেদ, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করতে পারব না যদি তুমি নিজেকেই খুঁজে না পাও।”
রাশেদ কিছু বলল না।
নীরা আবার বলল—
— “ভালোবাসা শুধু পাশে থাকার নাম না। কখনো কখনো দূরে সরে যাওয়াও ভালোবাসা।”
ফোন কেটে গেল।
রাশেদ ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ভেতরে একটা অদ্ভুত জাগরণ।
সে নিচে নামতে শুরু করল।
রাস্তার মোড়ে এসে সে একবার পেছনে তাকাল।
প্রেসক্লাব দাঁড়িয়ে আছে—একটা বিশাল ছায়ার মতো।
ভেতরে মানুষ আছে, কিন্তু আত্মা যেন নেই।
রাশেদ ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে লাগল।
তার মনে হলো, এই শহরে সবচেয়ে কঠিন কাজ সত্য বলা না—সত্যের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।
আর সেই দাঁড়িয়ে থাকা মানেই এক ধরনের একাকীত্ব।
দূরে কোথাও চাঁদ উঠেছে।
শহরের শব্দের ভেতরেও একটা নিঃশব্দ কণ্ঠ বলছে—
“সব ভাঙা জিনিসই শেষ না। কিছু ভাঙা জিনিস নতুন পথের শুরু।”
রাশেদ হাঁটতে থাকে।
তার পেছনে পড়ে থাকে প্রেসক্লাব।
আর সামনে—অজানা, কিন্তু সত্যের মতো ভারী একটা রাস্তা।
চলবে.........