ঢাকা, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬,
সময়: ০৪:২৭:৩১ AM

দেশজুড়ে ভয়াবহ অবস্থা হামের প্রাদুর্ভাবে

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
16-05-2026 08:37:41 PM
দেশজুড়ে ভয়াবহ অবস্থা হামের প্রাদুর্ভাবে

দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হামের প্রাদুর্ভাব। প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, আর অসংখ্য পরিবার হারাচ্ছে তাদের আদরের সন্তানকে। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ, গ্রামের পর গ্রামে দেখা দিয়েছে টিকার সংকট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব ছিল। অথচ অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতার কারণে আজ হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চারশ শিশুর মৃত্যুর খবর জানা গেছে, যা জনমনে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যেই বাংলাদেশের ৫৮টি জেলায় ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার শিশুর শরীরে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৬ জন শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের বেশিরভাগই ছিল পাঁচ বছরের নিচে এবং টিকা না পাওয়া শিশু।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সময়মতো দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু দেশে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় টিকার সরবরাহ অনিয়মিত, আবার কোথাও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নেই। ফলে গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুরা টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে টিকা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক মা অভিযোগ করেছেন, কয়েক মাস ধরেও তারা স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে টিকা পাননি। কোথাও বলা হয়েছে টিকা শেষ, কোথাও আবার স্বাস্থ্যকর্মী অনুপস্থিত। ফলে শিশুদের নির্ধারিত সময়ের টিকাদান ব্যাহত হয়েছে। এই অবহেলা এখন প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। হাম আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য মায়ের কোল খালি হচ্ছে—এর দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টিকা সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনার কারণে বহু এলাকায় প্রয়োজনীয় টিকা পৌঁছায়নি। এমনকি টিকা মজুত ব্যবস্থাপনাতেও গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও বলছে, বাংলাদেশে টিকার ঘাটতি ও শিশুদের নিয়মিত টিকাদানে ব্যর্থতাই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এখন হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও অপুষ্টি যুক্ত হলে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও মারাত্মক। WHO জানিয়েছে, আক্রান্তদের বড় অংশই দুই বছরের কম বয়সী শিশু।

এদিকে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। WHO, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং পরে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা ও শিশুদের টিকার আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল জরুরি কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতেও এমন সংকট তৈরি হতে পারে। তারা বলছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, টিকার সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এখনও অনেক পরিবার টিকা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানে না বা কুসংস্কারের কারণে শিশুদের টিকা দিতে অনীহা দেখায়।

বিশ্বজুড়েও হামের সংক্রমণ আবার বাড়ছে। WHO জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ হামে মারা গেছে, যাদের অধিকাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, টিকাদান কার্যক্রমে সামান্য দুর্বলতাও বড় ধরনের মহামারির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে চলমান এই সংকট তাই শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনারও বড় পরীক্ষা। শিশুদের জীবন রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। প্রতিটি শিশুর টিকা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যখাতকে জনবান্ধব করা ছাড়া এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আর কোনো বিকল্প নেই।