ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১০:৫২:২১ PM

উপন্যাস:“সম্পর্ক”

মান্নান মারুফ
03-04-2026 04:02:26 PM
উপন্যাস:“সম্পর্ক”

শেষ পর্ব 

জীবনের কিছু গল্পের শেষটা খুব জোরে আসে না—নিঃশব্দে আসে। কোনো নাটকীয়তা থাকে না, কোনো কান্না থাকে না, থাকে শুধু এক ধরনের উপলব্ধি। কুদ্দুছ আর নীপার গল্পটাও ঠিক তেমনই এক শেষের দিকে এসে দাঁড়িয়েছে।

সময় অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

যে সম্পর্ক একসময় তাদের জীবনের কেন্দ্র ছিল, আজ সেটা শুধুই একটা স্মৃতি—অস্পষ্ট, ম্লান, কিন্তু পুরোপুরি মুছে যায়নি।

নীপা এখন নিজের জীবনে স্থির। আরিয়ানের সাথে তার বিয়ে হয়েছে বেশ কিছুদিন। তাদের সংসার শান্ত, পরিপাটি। বড় কোনো আবেগ নেই, কিন্তু আছে বোঝাপড়া, সম্মান, আর এক ধরনের গভীর স্থিরতা।

একদিন সকালে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কফি খেতে খেতে নীপা হঠাৎ করে ভাবছিল—
“ভালবাসা আসলে কি?”

একসময় সে ভাবত—ভালবাসা মানে কারো জন্য পাগল হয়ে যাওয়া, কারো ছাড়া বাঁচতে না পারা।

কিন্তু এখন সে বুঝতে শিখেছে—ভালবাসা হয়তো এতটা নাটকীয় কিছু নয়।

হয়তো ভালবাসা মানে—কেউ একজন তোমার পাশে থাকবে, তোমাকে বুঝবে, তোমার সাথে জীবনটা ভাগ করে নেবে।

অন্যদিকে, কুদ্দুছও তার জীবনে প্রতিষ্ঠিত। তার ছোট্ট মেয়ে এখন স্কুলে যায়। তানিয়ার সাথে তার সম্পর্কও স্থির—দায়িত্ব আর বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে।

একদিন সন্ধ্যায়, বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে সে হঠাৎ করে নিজের অতীতের কথা ভাবছিল।

নীপার কথা।

সেই বৃষ্টির দিনগুলো, সেই নির্ভরতা, সেই আবেগ।

সে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল—
“আমি কি কখনো সত্যিই ওকে ভালবেসেছিলাম?”

উত্তরটা এবার সে একটু ভিন্নভাবে ভাবল।

হয়তো সে ভালবেসেছিল—কিন্তু তার নিজের মতো করে।

হয়তো সেটা ততটা গভীর ছিল না, যতটা নীপা অনুভব করত।

অথবা হয়তো সে কখনো বুঝতেই পারেনি—ভালবাসা আসলে কি।

মানুষ অনেক সময় নিজের অনুভূতিগুলোকে ঠিকমতো চিনতে পারে না।

আর যখন বুঝতে পারে—তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।

একদিন, হঠাৎ করেই, নীপা আর কুদ্দুছ আবার যোগাযোগে আসে।

কোনো পরিকল্পনা ছিল না—একটা সাধারণ সামাজিক মাধ্যমে ‘হ্যালো’।

“কেমন আছো?”—কুদ্দুছ লিখেছিল।

নীপা একটু ভেবে উত্তর দিয়েছিল,
“ভালো আছি। তুমি?”

এই সাধারণ কথোপকথন ধীরে ধীরে একটু বড় হলো।

তারা পুরোনো দিনের কথা বলল—কিন্তু কোনো আবেগ নিয়ে নয়, বরং এক ধরনের হাস্যরস নিয়ে।

“আমরা কত বোকা ছিলাম, তাই না?”—নীপা লিখল।

কুদ্দুছ উত্তর দিল,
“হয়তো। অথবা হয়তো সেটাই ছিল আমাদের সময়।”

এই কথাটা যেন পুরো গল্পটার সারমর্ম।

একটা সময় ছিল—যখন তারা একে অপরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কিন্তু সেই সময়টা এখন শেষ।

তারা দুজনেই এখন অন্য জীবনের মানুষ।

কিছুক্ষণ কথা বলার পর, হঠাৎ করেই নীপা লিখল,
“তুমি কি মনে করো, আমাদেরটা ভালবাসা ছিল?”

কুদ্দুছ একটু দেরি করে উত্তর দিল।

“আমি এখন মনে করি… সেটা একটা সত্যিকারের অনুভূতি ছিল। কিন্তু সেটা স্থায়ী হওয়ার জন্য না।”

নীপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর লিখল,
“হয়তো ঠিকই বলেছো।”

এই কথার পর আর খুব বেশি কথা হয়নি।

কারণ দুজনেই বুঝে গেছে—সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার দরকার নেই।

কিছু প্রশ্নের উত্তর না থাকাই ভালো।

কারণ সেই অজানাটাই হয়তো জীবনের একটা অংশ।

ভালবাসা—হয়তো এটা একটা ধোঁকা না।

আবার পুরোপুরি সত্যও না।

হয়তো ভালবাসা একটা সময়ের অনুভূতি—যা আসে, থাকে, তারপর চলে যায়।

কিন্তু সেই সময়টুকু, সেই অনুভূতিটুকু—মিথ্যা না।

কুদ্দুছ আর নীপার সম্পর্কটাও ঠিক তেমনই ছিল।

এটা হয়তো চিরস্থায়ী ছিল না, কিন্তু একসময় সত্য ছিল।

এবং সেই সত্যটাই তাদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।

শেষ পর্যন্ত, তারা কেউই একা থাকেনি।

দুজনেই নতুন মানুষ খুঁজে পেয়েছে, নতুন জীবন শুরু করেছে।

কেউ সুন্দরী বউ নিয়ে সংসার করছে, আর কেউ দূর দেশে স্বামীর সাথে নতুন জীবন গড়েছে।

একসময় যারা ভাবত—“তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না,”
আজ তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই বেঁচে আছে।

এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।

মানুষ সবকিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়।

ভালবাসা, বিচ্ছেদ, কষ্ট—সবকিছু।

এবং একসময়, সবকিছুই শুধু একটা গল্প হয়ে যায়।

একটা গল্প—যেটা আমরা মনে রাখি, কিন্তু আর ফিরে যেতে চাই না।

“সম্পর্ক”—এই গল্পটা তাই শেষ হয় কোনো কান্না দিয়ে না, কোনো বড় ঘটনা দিয়ে না।

শেষ হয় এক ধরনের নীরব উপলব্ধি দিয়ে—

যে,
ভালবাসা হয়তো স্থায়ী না,
কিন্তু তার প্রভাব চিরস্থায়ী।

আর সম্পর্ক—
সেটা হয়তো আমাদের জীবনে আসে শুধু আমাদের কিছু শেখানোর জন্য।

তারপর একদিন,
নিঃশব্দে…
চলে যায়।

সমাপ্ত।