ঢাকা, বুধবার, ২০ মে ২০২৬,
সময়: ১০:৫৬:৪৮ PM

আবাসিক এলাকায় ‘মদের বার’ ঘিরে উদ্বেগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
20-05-2026 08:04:20 PM
আবাসিক এলাকায় ‘মদের বার’ ঘিরে উদ্বেগ

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার একেবারে কাছাকাছি একাধিক ‘মদের বার’ গড়ে ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শিশু-কিশোর ও তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবক ও বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এলাকায় স্কুল-কলেজ, মসজিদ ও আবাসিক ভবনের পাশেই এসব বার পরিচালিত হচ্ছে। এতে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইতোমধ্যে লালমাটিয়া সোসাইটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বার মালিকদের কাছে আপত্তিপত্র পাঠানো হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, একটি বারের পাশেই রয়েছে বইপ্রেমীদের পরিচিত প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গল বুক’ এবং ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘অক্সফোর্ড স্কুল’। এছাড়া পুরো লালমাটিয়া এলাকায় রয়েছে অর্ধশতাধিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২০টির বেশি মসজিদ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এমন পরিবেশে মদের বার পরিচালনা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে মোহাম্মদপুরকে মাদকমুক্ত করতে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান পরিচালনা করছে, অন্যদিকে আবাসিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে প্রকাশ্যে মদের বার পরিচালিত হচ্ছে। তাদের মতে, একই এলাকায় মাদকের বিষয়ে প্রশাসনের দ্বৈত নীতি জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জুলফিকার আহমেদ বলেন, সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়ার সময় প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। অনেক শিক্ষার্থী কৌতূহলবশত এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে ভিড় করে এবং জানতে চায় ভেতরে কী হয়। এ ধরনের পরিবেশ শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “ঘনবসতিপূর্ণ একটি আবাসিক এলাকায় কীভাবে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। প্রশাসনের চোখের সামনেই এসব চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

অভিভাবক তৌহিদুল হাসান বলেন, তার সন্তান ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে এবং প্রতিদিন এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করে। অনেক সময় সন্তানকে একাই স্কুলে পাঠাতে হয়। এমন অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশে মদের বার পরিচালনা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “আমরা কয়েকজন অভিভাবক ইতোমধ্যে হাউজিং সোসাইটির কার্যালয়ে গিয়ে অভিযোগ জানিয়েছি। আমরা চাই দ্রুত এসব বার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ওয়ালিদ আবদুল্লাহ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে এ ধরনের বার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ভুল বার্তা যায় এবং কৌতূহল তৈরি হয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কিছু শিক্ষার্থী কৌতূহল থেকে এসব স্থানে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষা ও আবাসিক এলাকার পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রশাসনের উচিত স্থানীয় জনগণের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করা।”

এদিকে, লালমাটিয়া সোসাইটির সভাপতি হাজী বেলাল আহমেদ জানান, স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের অভিযোগের পর সোসাইটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “আবাসিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে এমন কার্যক্রম পুরো এলাকার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। নগর পরিকল্পনায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতিমালা প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ও আবাসিক এলাকার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে মদের বার বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপনে প্রশাসনের আরও সতর্ক হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে ফু-ওয়াং বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. শামীম বিল্লাহ বলেন, ধানমন্ডির যে বারটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি তাদের প্রতিষ্ঠানের নয়। তার দাবি, “কয়লা” নামের একটি প্রতিষ্ঠান এটি পরিচালনা করছে এবং আরিফ নামের এক ব্যক্তি তাদের কাছ থেকে স্বত্ব কিনে নিয়েছেন।

অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, গত দুই বছরে মহানগর এলাকায় নতুন কোনো মদের বারের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “কেউ অনুমোদন ছাড়া এমন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, কোনো এলাকায় বার স্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক অবস্থান বিবেচনা করে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি বার স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার নিয়ম নেই।

তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান। তিনি বলেন, “লালমাটিয়া এলাকায় নতুন কোনো মদের বার চালু হয়েছে—এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। কোনো মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট দফতর থেকেও এ বিষয়ে কোনো চিঠি পাইনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।