রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কোনো কথা নেই। যে রাজপথ একসময় ছিল কাঁদানে গ্যাস, লাঠিপেটা আর গ্রেপ্তারের আতঙ্কে ঘেরা, সেই রাজপথ পেরিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছাতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পার করেছে দীর্ঘ ১৭ বছরের এক কণ্টকাকীর্ণ পথ। ২০০৯ থেকে ২০২৪—দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, মামলা-হামলা, গুম-গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্য দিয়ে দলটি টিকে থেকেছে সাংগঠনিক শক্তি ও তৃণমূলের কর্মীদের আত্মত্যাগের ওপর ভর করে।
২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আসে বড় পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে দলটি এখন যেমন প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রমাণের চ্যালেঞ্জে রয়েছে, তেমনি নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তিকে আরও সুসংহত করার দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে আগামী ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। এক দশকেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিতব্য এই কাউন্সিলকে শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজন হিসেবে দেখছে না দলটি। বরং এটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে বিএনপির আগামী দিনের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক দর্শনের পুনর্গঠনের এক যুগান্তকারী টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে।
দলীয় সূত্র বলছে, এবারের কাউন্সিলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের। দীর্ঘ ১৭ বছর যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, হামলা-মামলা মাথায় নিয়েও দলের পাশে থেকেছেন—তাদের মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিএনপির হাইকমান্ড ইতোমধ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নির্ধারণে বিবেচনায় থাকবে আন্দোলনের ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্য।
দলটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের মতে, সরকারে আসার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দল ও সরকারের মধ্যে কার্যকর দূরত্ব বজায় রাখা। অতীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেক দলই সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল করে ফেলেছে। সরকারের সঙ্গে দল একীভূত হয়ে যাওয়ায় তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব বেড়েছে এবং দলীয় কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিএনপি এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভিন্ন কৌশলে এগোতে চায়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরকার পরিচালনা এবং দল পরিচালনাকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি সত্তা হিসেবে দাঁড় করানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন। সরকারের দায়িত্বে থাকা নেতারা রাষ্ট্র পরিচালনায় মনোযোগ দেবেন, অন্যদিকে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য থাকবেন আলাদা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আসবে, অন্যদিকে দলীয় সংগঠনও থাকবে সক্রিয় ও তৃণমূলমুখী।
ঢাকা মহানগর বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, “দলের যেসব নেতা সরকারে থাকবেন, তারা দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করবেন। কিন্তু বিএনপির মূল সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন আলাদা ও নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্ব। সরকার ও দল—এই দুটিকে আলাদাভাবে পরিচালনা করাই এখন সময়ের দাবি।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির এই কৌশল বাস্তবায়িত হলে দলটি দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে। কারণ, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে বিএনপির তৃণমূলের সঙ্গে একটি আবেগিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সেই সম্পর্ক ধরে রাখতে হলে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে সচল রাখা জরুরি। বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্ব তৈরি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন এখন দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগর, জেলা ও উপজেলায় সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় কাউন্সিলের আগেই ঢাকা মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। যেসব ওয়ার্ডে এখনও কমিটি হয়নি কিংবা আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত পূর্ণাঙ্গ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “নির্বাচনে কার্যকরভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে সংগঠনকে শক্তিশালী ও সুসংহত করা অপরিহার্য। তাই তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে সরকার হিসেবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অন্যদিকে দীর্ঘ আন্দোলনের দল হিসেবে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংগঠনিক শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখা। এই দুইয়ের সমন্বয় কতটা সফলভাবে করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করবে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান।
সব মিলিয়ে, বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল শুধু নেতৃত্ব নির্বাচন বা সাংগঠনিক রদবদলের আয়োজন নয়; এটি হতে যাচ্ছে দীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় উত্তরণের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ক্ষমতায় থেকেও দলকে সক্রিয়, তৃণমূলনির্ভর ও আদর্শভিত্তিক রাখার যে পরিকল্পনা বিএনপি গ্রহণ করেছে, তার সফল বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে দেশের রাজনীতিতে দলটির আগামী পথচলার গতি ও স্থায়িত্ব।