ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬,
সময়: ০৯:০১:২৬ PM

জহির উদ্দিন স্বপন:কৌশলী রাজনীতির নীরব স্থপতি

মান্নান মারুফ
19-05-2026 04:23:33 PM
জহির উদ্দিন স্বপন:কৌশলী রাজনীতির নীরব স্থপতি

 বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা উচ্চকণ্ঠ বক্তব্যের চেয়ে কর্মদক্ষতা,কৌশল এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। জহির উদ্দিন স্বপন সেই ধরনের একজন রাজনীতিবিদ, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ধৈর্য, মেধা ও সাংগঠনিক দক্ষতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন। সদালাপী, মিষ্টভাষী ও ঠান্ডা মাথার এই রাজনীতিক বর্তমানে বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আলোচনায় এসেছেন।

মাত্র কয়েক মাসের মন্ত্রিত্বেই তিনি তার মন্ত্রণালয়কে এমনভাবে পরিচালনা করেছেন, যেখানে অভিযোগের চেয়ে প্রশংসার সুরই বেশি শোনা যাচ্ছে। তবে তার এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, আদর্শিক অবস্থান, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং মানুষের পাশে থাকার একনিষ্ঠ মানসিকতা তাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

জহির উদ্দিন স্বপনের জন্ম ১৯৬০ সালের ২৯ জুন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন ছিলেন। খুলনার সেন্ট জোসেফ্‌স উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর সরকারি ব্রজলাল কলেজে পড়াশোনা করেন। কলেজজীবনেই তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ ছাত্রজীবন থেকেই। প্রথমদিকে তিনি বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও কৌশলী নেতৃত্বের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগদান করেন জহির উদ্দিন স্বপন। দল পরিবর্তনের পর খুব দ্রুতই তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ মুখে পরিণত হন। তার যোগাযোগ দক্ষতা, গণমাধ্যমে সাবলীল উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণী ক্ষমতা তাকে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিএনপি মিডিয়া সেলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক হিসেবে তিনি দলীয় প্রচার ও যোগাযোগ কৌশল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দলের সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর হিসেবেও তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হন। বিশেষ করে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামের সময় তিনি দলের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

জহির উদ্দিন স্বপনের রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার ধীর, হিসাবি ও কৌশলী পদক্ষেপ। তিনি কখনো হঠকারী সিদ্ধান্তে বিশ্বাসী নন। রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি শান্ত ও সংযত থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। অনেকেই মনে করেন, এই বৈশিষ্ট্যই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে পুনরায় র্র্নিবাচিত হন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন স্বপন। সরকারি ফলাফল অনুযায়ী তিনি এক লাখেরও বেশি ভোট পেয়ে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন।

তার এই বিজয় কেবল রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং এলাকাবাসীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও আস্থার প্রতিফলন বলেও মনে করা হয়। গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার সাধারণ মানুষের কাছে তিনি একজন সহজপ্রাপ্য নেতা হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও তিনি এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন।

স্থানীয়দের মতে, তিনি কখনো মানুষের বিপদের সময় এলাকা ছেড়ে দূরে থাকেননি। অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সামাজিক সংকট—সবক্ষেত্রেই তাকে সাধারণ মানুষের পাশে দেখা গেছে। তার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার পেছনে এটিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলায় নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েছেন জহির উদ্দিন স্বপন। দলীয় সংকট, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখেও তিনি নিজের আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। তার সমর্থকদের মতে, তিনি সবসময় ভদ্র, সংযত এবং কৌশলী আচরণ বজায় রেখেছেন। ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাবও তিনি অধিকাংশ সময় রাজনৈতিক ভাষা ও যুক্তির মাধ্যমে দিয়েছেন।

২০২৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর জহির উদ্দিন স্বপনকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে তিনি গণমাধ্যম, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও কৌশলগত প্রচারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তাকে উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার চেষ্টা করেন। তথ্য ও সম্প্রচার খাতে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করার উদ্যোগও তার পরিকল্পনার অংশ বলে জানা যায়।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রশ্নেও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, স্বাধীন গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে একই সঙ্গে তথ্যের অপব্যবহার ও গুজব প্রতিরোধেও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

জহির উদ্দিন স্বপনের রাজনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির প্রতি তার বিশ্বাস। তিনি মনে করেন, রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রিক না রেখে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার বিষয়েও তিনি ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করেছেন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি দুইবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া পার্লামেন্টারিয়ানস ফর গ্লোবাল অ্যাকশন (পিজিএ)-এর এশিয়া অঞ্চলের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন।

তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তার ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে সংঘাত, উত্তেজনা এবং তীব্র বাকযুদ্ধ প্রায়শই দৃশ্যমান, সেখানে জহির উদ্দিন স্বপনকে তুলনামূলক শান্ত ও মার্জিত রাজনীতিক হিসেবে দেখা হয়। তিনি কৌশলী হলেও আক্রমণাত্মক নন; বরং আলোচনাভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী।

সমালোচকরাও স্বীকার করেন যে, তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দুর্ব্যবহার বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলনামূলকভাবে নেই বললেই চলে । দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং দলীয় কর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা সহজ বিষয় নয়। কিন্তু তিনি সেই কাজটি অনেকটাই সফলভাবে করতে পেরেছেন।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং তথ্যপ্রবাহের দ্রুত পরিবর্তনের যুগে এই মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আরও বেড়েছে। জহির উদ্দিন স্বপনের সামনে তাই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি যদি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং দায়িত্বশীল যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে তার মন্ত্রিত্ব একটি সফল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। ইতোমধ্যে তার কিছু পদক্ষেপ রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিবাচক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

জহির উদ্দিন স্বপনের রাজনৈতিক যাত্রা মূলত সংগ্রাম, ধৈর্য ও পরিকল্পিত নেতৃত্বের গল্প। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসা এই নেতা নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে সুসংহত করেছেন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং যোগাযোগ কৌশলের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি এখন এমন একজন নেতা, যিনি একদিকে দলীয় কৌশলবিদ, অন্যদিকে জনগণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত একজন জনপ্রতিনিধি। তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এটুকু বলা যায়, জহির উদ্দিন স্বপন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছেন।