ঢাকা, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬,
সময়: ১২:৫৪:১৩ AM

কেন হতাশায় বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা

মান্নান মারুফ
21-05-2026 10:09:59 PM
কেন হতাশায় বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা

ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন মাসের মাথায় দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির অভ্যন্তরে এক ধরনের নীরব হতাশা ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা, হামলা ও দমন-পীড়নের পর দলটি ক্ষমতায় এলেও তৃণমূল পর্যায়ের অনেক কর্মী এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। দলীয় নেতাদের একটি অংশও মনে করছেন, সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা, সাংগঠনিক সিদ্ধান্তহীনতা এবং তৃণমূলের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার কারণে বিএনপির জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। পাশাপাশি দলীয় পদ-পদবি বণ্টন নিয়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে বলে জানা গেছে।

বর্তমান সরকারের প্রধান হিসেবে তারেক রহমান দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনে তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ স্বাভাবিক করাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, একটি বিধ্বস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভঙ্গুর অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধস এবং বিগত সরকারের দুর্নীতি ও লুটপাটের মতো বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যেই বিএনপি ১২ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করেছে। ফলে দেশের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান করা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দলের তৃণমূল কর্মীদেরও ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার সময় বিএনপির কর্মীরা যে রাজনৈতিক ও আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, ক্ষমতায় আসার পর সেই বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে ঘাট, ব্রিজের টোল, বাজারের চাঁদা, টেম্পু স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং ফুটপাত থেকে আদায়সহ নানা অনানুষ্ঠানিক আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক কর্মী আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, গত ১৬ বছর এসব খাত মাঠপর্যায়ের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ ভাগাভাগির মাধ্যমে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়া হতো। তবে ৫ আগস্টের পর বিএনপি দলীয়ভাবে চাঁদাবাজি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় এসব আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তৃণমূলের কিছু কর্মীর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে এবং দলের প্রতি আগের মতো উৎসাহ ও সক্রিয়তা কমে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তৃণমূল নেতাদের ভাষ্য, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তাদের বড় একটি অংশ আশা করেছিলেন ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পাবেন। কিন্তু বাস্তবে তারা সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন না। বরং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে স্থানীয় পর্যায়ের পুরোনো অনেক “আয়ের পথ” বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মীদের একটি অংশ নীরব হতাশায় ভুগছেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি-সমর্থিত ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের অনেকের লাইসেন্স বাতিল বা অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও অনেক ক্ষেত্রে সরকারি টেন্ডার কিংবা বড় প্রকল্পের কাজ এখনও আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী অথবা পুরোনো লাইসেন্সধারীদের হাতেই রয়ে গেছে। বিএনপির তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, যারা দীর্ঘদিন আন্দোলন করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারা এখনো অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।

দলের অভ্যন্তরে আরেকটি বড় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে মন্ত্রিসভা গঠনকে কেন্দ্র করে। বহু ত্যাগী নেতা ও দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সংগঠক মন্ত্রীত্ব কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদ না পাওয়ায় তাদের অনুসারীদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, যেসব নেতাকে ঘিরে কর্মীরা সক্রিয় ছিলেন, তারা পদবঞ্চিত হওয়ায় অনেক কর্মীও নীরব হয়ে গেছেন। এতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া দলীয় পদ-পদবি বণ্টন নিয়েও বিভিন্ন জেলায় ক্ষোভ রয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় সক্রিয় না থাকা কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিদের অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে, অথচ দীর্ঘদিন মাঠে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীরা উপেক্ষিত হচ্ছেন। এতে দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ আরও বাড়ছে।

বিএনপির অনেক নেতাকর্মী দাবি করছেন, বিগত বছরগুলোতে তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জমিজমা দখল করা হয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর তারা আশা করেছিলেন সেগুলো দ্রুত উদ্ধার করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সমালোচনার ভয়ে অনেকেই নিজেদের সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছেন না। কেউ উদ্যোগ নিলেই তাকে “চাঁদাবাজ” বা “দখলদার” হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কর্মী এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হলো প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আবেগ ও উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর জটিলতা সেই প্রত্যাশা পূরণকে কঠিন করে তুলেছে।

শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা আরও বেশি দৃশ্যমান বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর গ্রামের বাজার ও চায়ের দোকানগুলোতে জামায়াত ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সরব উপস্থিতি থাকলেও বিএনপির কর্মীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। অনেক এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীরা আড্ডায় অংশ নিলেও তাদের মধ্যে আগের মতো আত্মবিশ্বাস ও উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে না।

গ্রামাঞ্চলের একাধিক কর্মী জানান, তারা এখনো নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৃণমূলের বাস্তব সমস্যা অনুধাবন করতে পারছে না। আবার অনেকের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক যোগাযোগও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তৃণমূলকে পুনরুজ্জীবিত করা। শুধুমাত্র ক্ষমতায় আসাই একটি রাজনৈতিক দলের সফলতার শেষ ধাপ নয়; বরং ক্ষমতায় এসে সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, কর্মীদের মূল্যায়ন করা এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ-অভিমান দূর করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে দলের ভেতরে নীরব বিভক্তি আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকেরা আরও মনে করেন, বিএনপিকে এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতে স্থানীয় পর্যায়ে যে ধরনের অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা গড়ে উঠেছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে কর্মীদের জন্য বৈধ ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক-সামাজিক সম্পৃক্ততার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন, ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের পুনর্বাসন এবং সাংগঠনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

দলের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশও স্বীকার করছেন, তৃণমূলের হতাশা বাস্তব এবং এটি দ্রুত মোকাবিলা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, যদি কর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা না যায়, তাহলে গ্রাম ও মহল্লা পর্যায়ে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে তরুণ কর্মীদের ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সার্বিকভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এখন একটি রূপান্তরের সময় অতিক্রম করছে। বিরোধী দলের আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতি থেকে সরকার পরিচালনার বাস্তবতায় প্রবেশের এই সময়ে দলটির ভেতরে নানা ধরনের চাপ ও অসন্তোষ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তবে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে তৃণমূলের হতাশা আরও বাড়লে স্থানীয় পর্যায়ে দলের রাজনৈতিক উপস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।