পর্ব – ৪
তুমি আমার কাছে নিঃশ্বাসের মতো হয়ে গিয়েছো—
যেটা ছাড়া আমি এক মুহূর্তও বাঁচতে পারি না।
শোন নিপা, কপালে যদি অবহেলা লেখা থাকে—
তাহলে হাজার চেষ্টা করলেও কারও আপন হওয়া যায় না।
ভালোবাসলেও ভালোবাসা পাওয়া যায় না।
সময় এগিয়ে যাচ্ছে।
দিন যায়, রাত আসে—আবার রাত ভেঙে সকাল হয়।
সবকিছু নিয়ম মেনে চলছে।
শুধু আমার ভেতরের সময়টা যেন আটকে আছে সেই জায়গায়—
যেখানে তুমি শেষবার আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলে,
“ভালো থেকো।”
এই দুইটা শব্দ এখন আমার জীবনের সবচেয়ে ভারী স্মৃতি।
আমি নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি।
বই পড়ি, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাই, শহরের রাস্তায় হেঁটে বেড়াই—
কিন্তু যতই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাই, ততই তুমি সামনে চলে আসো।
একটা গান শুনলে তোমার কথা মনে পড়ে।
রাস্তায় হাঁটলে মনে পড়ে—আমরা কয়েকজন বন্ধু একদিন একসঙ্গে হেঁটেছিলাম।
একটা শব্দ, একটা গন্ধ—সবকিছুতেই তুমি।
আমি বুঝতে পারলাম—
ভালোবাসা শুধু মানুষের সঙ্গে থাকে না,
ভালোবাসা জায়গার সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
আর সেই স্মৃতিগুলো থেকে পালানো যায় না।
একদিন হঠাৎ করে রাকিব বলল,
— “তুই কি এখনো ওকে ভুলতে পারিসনি?”
আমি একটু হেসে বললাম,
— “সবকিছু কি ভোলা যায়?”
সে চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “সময় লাগবে… কিন্তু পারবি।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
— “হয়তো।”
কিন্তু আমি জানি—
কিছু ভালোবাসা মুছে যায় না।
বরং সময় যত যায়, ততই গভীরে গেঁথে যায়।
মাঝে মাঝে একা প্রশ্ন করি নিপা, তুমি এখন কোথায় আছো?
তুমি কি সুখে আছো?
তোমার নতুন সংসার, নতুন মানুষ—
সবকিছু কি তোমাকে সেই শান্তিটা দিতে পেরেছে,
যেটা তুমি খুঁজছিলে?
আমি জানি না।
জানার অধিকারও নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা করে।
একদিন সন্ধ্যায় আমি সেই পুরনো গাছটার নিচে গিয়ে বসেছিলাম।
অনেকদিন পর।
সবকিছু একই আছে—
গাছটা, বাতাস, চারপাশের নীরবতা।
শুধু তুমি নেই।
আমি চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম।
মনে হলো—তুমি আমার পাশে বসে আছো।
তোমার সেই মৃদু কণ্ঠে বলছো—
“চুপ করে আছো কেন?”
আমি ধীরে বললাম—
“কথা বলার মতো কেউ নেই।”
চোখ খুলে দেখি—আমি একা।
সবকিছুই কল্পনা।
কিন্তু এই কল্পনাটুকুই এখন আমার একমাত্র আশ্রয়।
আমি অনেক ভেবেছি—
আমার দোষটা কোথায় ছিল?
আমি কি কম ভালোবেসেছিলাম?
না কি আমি খুব দেরিতে বুঝেছিলাম?
হয়তো দুটোই।
হয়তো আমি বুঝতে পারিনি—
ভালোবাসা শুধু অনুভব করলেই হয় না,
কখনো কখনো সেটা বলে দিতেও হয়।
তুমি আমার জীবনে এসেছিলে—
একটা আলো হয়ে।
আর এখন তুমি নেই—
কিন্তু তোমার চলে যাওয়ার পর সেই আলোটা নিভে গেছে।
আমি এখন অন্ধকারে হাঁটছি।
নিপা, তুমি জানো?
আমি এখনো তোমার জন্য অপেক্ষা করি।
অযৌক্তিক, অবাস্তব—তবুও করি।
মনে মনে ভাবি—
হয়তো একদিন তুমি ফিরে আসবে।
হয়তো বলবে—
“আমি ভুল করেছি।”
কিন্তু আমি জানি—এটা কখনো হবে না।
তবুও, এই আশা টুকু আমি ছাড়তে পারি না।
কারণ এই আশাটুকুই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।
একদিন রাতে খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম।
জ্বর, মাথা ব্যথা—সব মিলিয়ে শরীরটা ভেঙে যাচ্ছিল।
বিছানায় শুয়ে ছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো—
এই মুহূর্তে যদি তুমি থাকতে!
তুমি হয়তো আমার কপালে হাত রেখে বলতে—
“এত অবহেলা করো নিজের প্রতি?”
এই ছোট ছোট কল্পনাগুলোই এখন আমার সবচেয়ে বড় সত্য।
আমি বুঝতে পারছি—
আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসিনি,
আমি তোমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম।
তুমি ছিলে আমার অভ্যাস।
আর এখন সেই অভ্যাসটা হঠাৎ করে চলে গেছে।
তাই এই শূন্যতা।
কপালে যদি অবহেলা লেখা থাকে—
তাহলে সত্যিই কারও আপন হওয়া যায় না।
আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম—
নিঃস্বার্থভাবে।
কিন্তু সেই ভালোবাসার কোনো মূল্য ছিল না।
তুমি হয়তো কখনো বুঝতে পারোনি—
আমি তোমাকে কতটা চেয়েছিলাম।
হয়তো বুঝলেও—কিছু করার ছিল না।
কারণ সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না।
একদিন আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো—
আমি বদলে গেছি।
আগের সেই হাসি নেই,
চোখে সেই উজ্জ্বলতা নেই।
আমি এখন অনেক শান্ত—
কিন্তু এই শান্তির ভেতরে একটা গভীর ক্লান্তি লুকিয়ে আছে।
আমি এখন আর কারও কাছে কিছু চাই না।
না ভালোবাসা, না কাছাকাছি আসা।
কারণ আমি জানি—
আবার হারানোর মতো শক্তি আমার নেই।
নিপা, তুমি আমার কাছে নিঃশ্বাসের মতো।
তুমি নেই—তবুও আমি বেঁচে আছি।
কিন্তু এই বেঁচে থাকাটা পূর্ণ না।
এটা একটা অসম্পূর্ণ জীবন।
আমি জানি না—
এই অনুভূতি থেকে আমি কখনো মুক্তি পাব কি না।
হয়তো পাব না।
হয়তো এই ব্যথাটাই আমার সঙ্গী হয়ে থাকবে—
সারাজীবন।
তবুও আমি বেঁচে থাকব।
কারণ তুমি একদিন আমাকে শিখিয়েছিলে—
ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া না,
ভালোবাসা মানে ছেড়ে দিতেও জানা।
আমি তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি, নিপা।
কিন্তু ভুলে যাইনি।
ভুলতে পারব না।
তুমি যেখানে থাকো—ভালো থেকো।
তোমার সুখই আমার শেষ প্রার্থনা।
আর আমি?
আমি এখনো হাঁটছি—
একটা নিঃশব্দ যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে।
যেখানে তুমি আছো—
কিন্তু নেই।
এই দ্বন্দ্বটাই আমার জীবন।
এই অনুভূতিটাই আমার সত্য।
(চলবে…)