ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৭:০৭:২১ PM

উপন্যাস:“অনুভূতি”

মান্নান মারুফ
31-03-2026 01:05:13 PM
উপন্যাস:“অনুভূতি”

পর্ব – ২

নিপা, আমি চাই তুমি আমার চোখের মনি হয়ে থাকো।

আমি যেদিকে তাকাই —সেই দিকে তোমাকেই দেখি।
তুমি যেন আমার কাছে দৃশ্য হয়ে থাকো, তুমি রঙ হয়ে থাকো, তুমি আলো হয়ে থাকো।

কারণ তুমি ছাড়া এই পৃথিবীটা আমার কাছে এক বিশাল শ্মশান—
যেখানে আমি প্রতিদিন জীবন্ত লাশ হয়ে ঘুরে বেড়াই।

নিপার বিয়ের খবর শোনার পর দিনগুলো কেমন যেন অচেনা হয়ে গেল।

সবকিছু আগের মতোই চলছে—কলেজে ক্লাস হচ্ছে, বন্ধুরা হাসছে, আড্ডা দিচ্ছে, চারপাশে জীবনের স্বাভাবিক গতি। কিন্তু আমার ভেতরের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ থেমে গেছে।

আমি হাঁটি, কথা বলি, হাসার চেষ্টা করি—কিন্তু সবকিছু যেন অভিনয়।

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি নিজের জীবনটা বাইরে থেকে দেখছি।
একটা চরিত্র, যে বেঁচে আছে—কিন্তু তার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই।

নিপার সঙ্গে দেখা এখনো হয়।

কিন্তু সেই দেখা আর আগের মতো নয়।

আগে ওর পাশে বসলে একটা অদ্ভুত শান্তি পেতাম। এখন বসলে মনে হয়—আমি এমন একটা জায়গায় বসে আছি, যেটা আমার আর না।

ওর চোখে আগের সেই নির্ভারতা নেই।
আমার চোখেও নেই সেই সাহস, সেই স্বাভাবিকতা।

আমাদের কথাগুলো এখন ছোট হয়ে গেছে।

— “কেমন আছ?”
— “ভালো।”
— “তুমি?”
— “হ্যাঁ… ভালো।”

এই “ভালো” শব্দটার ভেতরে কত অজানা কষ্ট, কত না বলা কথা লুকিয়ে থাকে—তা আমরা দুজনেই জানি।

একদিন ও বলল,
— “তুমি আগের মতো কথা বলো না কেন?”

আমি একটু হেসে বললাম,
— “আগের মতো কি সব আছে?”

নিপা চুপ করে গেল।

ও হয়তো উত্তর জানত, কিন্তু বলতে পারছিল না।

আমিও পারছিলাম না।

আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন হচ্ছিল।

আগে আমি নিপাকে ভালোবাসতাম—নির্মল, নিঃশব্দ একটা ভালোবাসা।
এখন সেই ভালোবাসার সঙ্গে মিশে গেছে ব্যথা, অভিমান, আর এক ধরনের শূন্যতা।

কিন্তু তবুও, আমি ওকে ঘৃণা করতে পারি না।

চেষ্টা করেছি।

নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি—ও আমাকে কষ্ট দিয়েছে, ও আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তাই ওকে ভুলে যাওয়া উচিত।

কিন্তু প্রতিবারই হেরে যাচ্ছি।

কারণ ভালোবাসা কোনো যুক্তি মানে না।

নিপার বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, আমার ভেতরের অস্থিরতাও তত বাড়ছিল।

রাতে ঘুম আসত না।

আমি ছাদের ওপর বসে থাকতাম—আকাশের দিকে তাকিয়ে।

মনে হতো, এই বিশাল আকাশের কোথাও কি নিপা আছে?
ও কি আমার কথা ভাবে?

নাকি ও ইতিমধ্যেই অন্য কারও জীবনের অংশ হয়ে গেছে?

এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ছিল না।

শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছিল।

একদিন হঠাৎ নিপা আমাকে বলল,
— “তুমি কি আমার বিয়েতে আসবে?”

প্রশ্নটা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

আমি কি ওর বিয়েতে যেতে পারব?

আমি কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব—ও অন্য কারও হাত ধরে নতুন জীবনে পা রাখছে?

আমি কি এতটা শক্ত?

আমি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম।

তারপর বললাম,
— “জানি না।”

নিপা আমার দিকে তাকাল।
ওর চোখে এক ঝলক কষ্ট দেখলাম।

— “না এলেও কিছু বলব না,” ও ধীরে বলল।

আমি মাথা নেড়ে হাসার চেষ্টা করলাম।

কিন্তু সেই হাসিটা ছিল ভাঙা।

সেদিন রাতে আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম—

আমি কি সত্যিই ওকে ভালোবাসি?

যদি ভালোবাসি, তাহলে ওর সুখে আমার খুশি হওয়া উচিত না?

কিন্তু আমি খুশি হতে পারছি না।

বরং মনে হচ্ছে—আমার ভেতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে নেওয়া হচ্ছে।

তাহলে এটা কি ভালোবাসা?

নাকি এটা স্বার্থপরতা?

আমি উত্তর খুঁজে পেলাম না।

নিপার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল বিয়ের আগের দিন।

ও আমাকে ডেকেছিল।

আমরা আবার সেই গাছটার নিচে বসেছিলাম—যেখানে আমাদের গল্প শুরু হয়েছিল।

সবকিছু একই আছে, শুধু আমরা বদলে গেছি।

নিপা আজ অন্যরকম লাগছিল।

ওর চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি, আবার সেই সঙ্গে গভীর কষ্টও।

— “তুমি আসবে না, তাই না?” ও জিজ্ঞেস করল।

আমি কিছু বললাম না।

ও একটু হেসে বলল,
— “ঠিক আছে।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর ও বলল,
— “তুমি জানো, তুমি আমার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ।”

আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

— “তুমি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছ… ভালোবাসা, ধৈর্য, বোঝাপড়া…”

আমি তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে।

— “কিন্তু সব ভালোবাসা একসঙ্গে থাকা হয় না,” ও ধীরে বলল।

এই কথাটা শুনে মনে হলো—আমার ভেতরের সবকিছু ভেঙে পড়ছে।

আমি অনেক কষ্টে বললাম,
— “তুমি কি কখনো… আমাকে ভালোবেসেছিলে?”

প্রশ্নটা করতে আমার এত দেরি হলো কেন?

নিপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খুব ধীরে বলল,
— “সব অনুভূতির নাম দেওয়া যায় না।”

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

এই উত্তরটা আমি চাইনি।

কিন্তু হয়তো এটাই সত্য।

বিদায় নেওয়ার সময় নিপা বলল,
— “ভালো থেকো।”

আমি বললাম,
— “তুমিও।”

এই দুটি শব্দের ভেতরে আমাদের পুরো গল্পটা লুকিয়ে ছিল।

নিপার বিয়ের দিন আমি কোথাও যাইনি।

সারাদিন ঘরে ছিলাম।

মোবাইল বন্ধ।

দরজা বন্ধ।

নিজেকে বন্ধ করে রেখেছিলাম।

কিন্তু তবুও, মনে হচ্ছিল—আমি সব দেখছি।

ওর হাসি, ওর সাজ, ওর নতুন জীবনে পা রাখা—সবকিছু।

আর আমি… আমি শুধু দূর থেকে দেখছি।

রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলাম।

চোখ দুটো লাল, মুখে ক্লান্তি।

আমি নিজের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম—

“এই তুমি?
এই সেই মানুষ, যে একসময় স্বপ্ন দেখত?”

আজ সেই স্বপ্নগুলো কোথায়?

আমি জানি না, সামনে কী আছে।

নিপা এখন অন্য কারও জীবনের অংশ।

আর আমি?

আমি এখনো সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি—
স্মৃতির ভেতরে আটকে।

নিপা, তুমি যদি কখনো জানতে—

আমি আজও তোমাকে চোখের মনি করে রেখেছি।

আমি যা দেখি, সেখানে তোমাকেই খুঁজি।

তুমি ছাড়া এই পৃথিবীটা এখনো আমার কাছে শ্মশান।

আর আমি এখনো সেই জীবন্ত লাশ—
যে এখনও বেঁচে আছে, শুধু তোমার স্মৃতির জন্য।

কিন্তু একদিন কি আমি মুক্তি পাব?

এই অনুভূতি থেকে?

এই ব্যথা থেকে?

নাকি এটাই আমার চিরকালের সঙ্গী হয়ে থাকবে?

আমি জানি না।

শুধু জানি—
তুমি আছো, আমার সাথে, আমার ভেতরে।

আর এই “অনুভূতি”ই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।

(চলবে…)