পর্ব–১
মুদি দোকানের ভেতরে হালকা ভিড়। বিকেলের নরম আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে মেঝেতে পড়েছে। বাতাসে শুকনো মরিচ আর চায়ের পাতার গন্ধ মিশে আছে। দোকানের কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে কুদ্দুছ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনছিল। তার চোখে ক্লান্তির ছাপ—যেন বহু বছর ধরে সে এক অদৃশ্য বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।
হঠাৎ দরজার দিকে তাকিয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠল।
একজন মহিলা ধীরে ধীরে দোকানের ভেতরে ঢুকছে। মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, চুলের কিছু অংশ মুখের উপর পড়ে আছে। কিন্তু তার গলায় ঝুলে থাকা ছোট্ট একটি লকেট—সেটা যেন কুদ্দুছের চোখে বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল।
কুদ্দুছ স্থির হয়ে গেল।
ওই লকেটটা…
ওটা সে খুব ভালো করেই চেনে।
বিশ বছর আগে নিজের হাতে কিনে দিয়েছিল সে। ছোট্ট সোনালি লকেট—ভেতরে দুজনের একটা ছোট ছবি ছিল। লুসি হেসে বলেছিল,
“এটা আমি কোনোদিন খুলব না।”
কুদ্দুছের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
“না… এটা কি সম্ভব?”
নিজের মনেই ফিসফিস করল সে।
মহিলাটা কিছু চাল-ডাল কিনে কাউন্টারে টাকা দিল। তার কণ্ঠস্বর খুব শান্ত, কিন্তু কুদ্দুছের কাছে সেই কণ্ঠস্বর যেন দূর অতীতের কোনো প্রতিধ্বনি।
কুদ্দুছ সাহস করে একটু সামনে এগোল।
কিন্তু ঠিক তখনই মহিলা দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।
কুদ্দুছ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মাথার ভেতরে একসাথে বিশ বছর আগের স্মৃতিগুলো জেগে উঠতে লাগল—যেন সময়ের দরজা হঠাৎ খুলে গেছে।
বিশ বছর আগে।
তখন কুদ্দুছ স্কুলে পড়ে। ছেলেটা একটু চুপচাপ স্বভাবের ছিল, কিন্তু মনটা ছিল খুব নরম। স্কুলের প্রথম দিনগুলোর একদিন সে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই নতুন এক মেয়ে স্কুলে আসে।
তার নাম—লুসি।
সাদা ফ্রক, কাঁধ পর্যন্ত নরম চুল, আর মুখে এক অদ্ভুত মিষ্টি হাসি।
প্রথমবার তাকে দেখেই কুদ্দুছের মনে হলো—
এই মেয়েটা যেন অন্যরকম।
কুদ্দুছ কখনও প্রেম-ভালোবাসা এসব নিয়ে ভাবেনি। কিন্তু সেই দিনটায় তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নিল।
সেদিন থেকেই লুসিকে সে লক্ষ্য করতে শুরু করল।
ক্লাসে, মাঠে, লাইব্রেরিতে—যেখানেই লুসি থাকত, কুদ্দুছের চোখ যেন সেখানেই আটকে থাকত।
ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে কথা শুরু হলো।
প্রথমে পড়াশোনা নিয়ে, তারপর বন্ধুত্ব, তারপর সেই বন্ধুত্ব একসময় নিঃশব্দে প্রেমে রূপ নিল।
লুসি ছিল খুব প্রাণবন্ত মেয়ে। হাসতে ভালোবাসত, গান গাইত, আর ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ খুঁজে পেত।
একদিন স্কুল ছুটির পরে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে লুসি বলেছিল,
“জানো কুদ্দুছ, আমার স্বপ্ন খুব বড় কিছু না। শুধু এমন একটা জীবন চাই যেখানে কেউ আমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসবে।”
কুদ্দুছ তখন কিছু বলেনি।
শুধু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল—
“আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাব না।”
স্কুল শেষ হলো। তারপর কলেজ।
এই সময়টায় তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে উঠল।
অনেক বাধা এসেছিল। লুসির পরিবার প্রথমে এই সম্পর্ক মেনে নিতে চায়নি। কিন্তু লুসি খুব দৃঢ় ছিল।
সে একদিন স্পষ্ট বলেছিল,
“আমি কুদ্দুছ ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না।”
অবশেষে কলেজ শেষ হওয়ার পর তারা বিয়ে করে ফেলল।
সেদিনটা ছিল খুব সাধারণ একটা দিন—কোনো বড় আয়োজন ছিল না। কিন্তু তাদের চোখে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
বিয়ের রাতে কুদ্দুছ লুসিকে সেই সোনালি লকেটটা উপহার দিয়েছিল।
লুসি লকেটটা হাতে নিয়ে হেসে বলেছিল—
“এটার ভেতরে কী আছে?”
কুদ্দুছ লকেটটা খুলে দেখিয়েছিল।
ভেতরে তাদের দুজনের ছোট একটা ছবি।
লুসির চোখে তখন পানি চলে এসেছিল।
সে কুদ্দুছকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল—
“আমি এটা কোনোদিন খুলব না।”
তারপর শুরু হলো তাদের সংসার।
ছোট্ট একটা ভাড়া বাসা। খুব বেশি কিছু ছিল না—কিন্তু ছিল শান্তি, ভালোবাসা আর অগাধ স্বপ্ন।
লুসি খুব যত্ন করে সংসার সামলাত।
সকালবেলা কুদ্দুছ অফিসে যাওয়ার আগে লুসি নিজে হাতে নাস্তা বানিয়ে দিত। আর কুদ্দুছ বের হওয়ার সময় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাসত।
কুদ্দুছ মাঝে মাঝে মজা করে বলত—
“তুমি না থাকলে আমি তো বাঁচতেই পারতাম না।”
লুসি হেসে বলত—
“তুমি থাকলে আমি কখনও একা হব না।”
এইভাবে একে একে এগারোটা বছর কেটে গেল।
তাদের জীবনে বড় কোনো ঝড় আসেনি।
কিন্তু সুখের গল্পগুলো কখনও কখনও খুব হঠাৎ করেই বদলে যায়।
সেদিন রাতটা ছিল অদ্ভুত শান্ত।
কুদ্দুছ অফিস থেকে একটু দেরিতে ফিরছিল। ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা একটা নম্বর।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে এক কঠিন কণ্ঠ শোনা গেল।
“আপনি কি কুদ্দুছ সাহেব?”
“জি, বলছি।”
“আমি থানার পক্ষ থেকে বলছি। আপনার স্ত্রী লুসি একটা সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছেন।”
কুদ্দুছের শরীর হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কোথায়?”
“হাইওয়ের পাশে। আপনি দ্রুত আসুন।”
ফোনটা কেটে গেল।
কুদ্দুছের মাথা কাজ করছিল না। সে তাড়াতাড়ি একটা রিকশা ধরে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটল।
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।
দূর থেকে লাল-নীল পুলিশের আলো দেখা যাচ্ছিল।
কুদ্দুছ দৌড়ে সামনে গেল।
রাস্তার পাশে একটা গাড়ি উল্টে পড়ে আছে। গাড়িটার সামনের অংশ পুরোপুরি ভেঙে গেছে।
এটা লুসির গাড়ি।
কুদ্দুছের বুক কেঁপে উঠল।
সে পাগলের মতো চারপাশে তাকাতে লাগল।
“লুসি কোথায়?”
“আমার স্ত্রী কোথায়?”
কেউ ঠিকমতো উত্তর দিতে পারছিল না।
একজন পুলিশ অফিসার এসে বলল,
“গাড়ির ভেতরে কাউকে পাওয়া যায়নি।”
কুদ্দুছ যেন কিছুই বুঝতে পারছিল না।
সে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে তাকাল।
সিটের ওপর একটা কাগজ পড়ে আছে।
হাত কাঁপতে কাঁপতে সে কাগজটা তুলে নিল।
সেখানে কয়েকটা শব্দ লেখা ছিল—
“আমাকে খুঁজো না।”
কুদ্দুছের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
“এটা… এটা কীভাবে সম্ভব?”
লুসি কোথায় গেল?
কেউ তাকে নিয়ে গেল?
নাকি সে নিজেই চলে গেল?
সেই রাত থেকে শুরু হলো কুদ্দুছের দীর্ঘ অপেক্ষা।
দিন গড়াল, মাস গড়াল, বছর কেটে গেল।
কিন্তু লুসি আর ফিরে এল না।
পুলিশ তদন্ত করেছিল, কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ধীরে ধীরে সবাই ধরে নিল—লুসি হয়তো আর বেঁচে নেই।
কিন্তু কুদ্দুছ কখনও সেটা বিশ্বাস করতে পারেনি।
তার মনে সবসময় একটা প্রশ্ন ঘুরত—
“লুসি যদি মারা যায়, তাহলে তার লাশ কোথায়?”
আজ বিশ বছর পর…
মুদি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কুদ্দুছের বুকের ভেতর আবার সেই পুরোনো ঝড় শুরু হয়েছে।
সে দ্রুত দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
চারদিকে তাকাল।
রাস্তার ভিড়ের মধ্যে সেই মহিলাকে আর দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু তার চোখের সামনে এখনও স্পষ্ট—
সেই সোনালি লকেট।
ঠিক একই লকেট।
যেটা সে বিশ বছর আগে নিজের হাতে লুসিকে দিয়েছিল।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—
“লুসি…
তুমি কি সত্যিই ফিরে এসেছ?”
তার মনে হলো—
বিশ বছর ধরে যে রহস্য তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, হয়তো তার উত্তর খুব কাছেই আছে।
কিন্তু সে জানে না—
সেই উত্তর তার জীবনকে আরও ভেঙে দেবে,
নাকি হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে আবার ফিরিয়ে দেবে।
চলবে…