ঢাকা, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৯:২৭:২৫ PM

উপন্যাস: জটিল

মান্নান মারুফ
06-03-2026 01:00:11 PM
উপন্যাস: জটিল

পর্ব–৫

আমাদের বাসা থেকে মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে হেঁটে হেঁটে তাজুলের অফিসে যাওয়া যায়। আমরা সেক্টরের বাইরে থাকি, তবে ওর অফিস সেক্টরের ভেতরে। বাসা থেকে বের হয়ে রেললাইন পার হলেই ওর অফিস।

যখন আমি চাকরি করতাম না, তখন নিজের অফিসের কাছেই বাসা নিয়েছিল তাজুল। সবকিছুই যেন ওর সুবিধা অনুযায়ী গুছানো ছিল। সকালে বের হয়ে হেঁটে অফিসে যাওয়া, দুপুরে বাসায় ফিরে খাওয়া, আবার বিকেলে অফিস—একটা নিয়মমাফিক জীবন।

কিন্তু বছর খানেক আগে যখন আমি চাকরি নিলাম, তখন হিসাবটা একটু বদলে গেল। আমার অফিস অনেক দূরে। তবে কোম্পানির গাড়ি আছে, তাই যাতায়াতে তেমন সমস্যা হয় না। সেই কারণেই বাসা আর পরিবর্তন করা হয়নি।

প্রতিদিন আমি বাসা থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে যাই। আর তাজুল লাঞ্চ টাইমে বাসায় গিয়ে খায়।

এই পর্যন্ত সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু আজকের দিনটা যেন অদ্ভুতভাবে বদলে গেল।

আমি তাজুলের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— আমি তো সকালে রান্না করিনি, তাহলে বাসায় গেলে কেন জানতে পারি?

তাজুল একটু থেমে বলল,
— তোমার মোবাইল আজকে বাসায় রেখে আসছো, তাই না?

আমি মাথা নাড়লাম।

— হ্যাঁ। কিন্তু কী হয়েছে সেটা বলো না কেন?

তাজুল ধীরে বলল,
— বারোটার দিকে আফরিন আমার কাছে কল করেছিল।

আমি যেন হঠাৎ চমকে উঠলাম।

আফরিন!

আমার ছোট বোন। আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট। এখনো তার বিয়ে হয়নি। মাঝে মাঝে সে হঠাৎ করেই আমাদের বাসায় চলে আসে। আমার সাথে গল্প করবে, রান্নাঘরে কিছু বানাবে, আবার হাসতে হাসতে ফিরে যাবে।

কিন্তু মাত্র দুদিন আগেই তো সে আমাদের বাসায় এসেছিল।

এই কয়দিনের মধ্যে আবার আসবে—এটা আমি ভাবতেই পারিনি।

আমার মনে হঠাৎ একটা সন্দেহ জন্ম নিল।

আমি তাজুলের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— আফরিন কল দিয়ে কী বলেছে?

তাজুল বলল,
— আমাকে বললো, “দুলাভাই, আপা তো কল রিসিভ করে না। আমি তো আপনাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।”

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

আমরা থাকি উত্তরা। আর আমার মা-বাবা সবাই মিলে থাকে ধানমন্ডিতে। এত দূর থেকে আফরিন এভাবে হঠাৎ করে চলে আসবে—এটা খুব স্বাভাবিক নয়।

আমার মনে হল—তাজুল হয়তো তাকে ডেকে এনেছে।

গত রাতের ঝগড়ার কথা বলেছে। হয়তো ভেবেছে, আফরিন এসে আমাকে বুঝাবে।

আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম,
— আফরিনকে আমাদের ঝগড়ার কথা বলতে গেলে কেন?

তাজুল দ্রুত মাথা নাড়ল।

— আমি তো বলিনি কিছু।

তারপর একটু থেমে বলল,
— সে আমাকে হঠাৎ কল দিয়ে বললো যে সে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তখন আমি তাকে আমার অফিসের সামনে যেতে বলি।

আমি চুপ করে শুনছিলাম।

তাজুল বলল,

— তারপর আফরিন অফিসের সামনে গেল। আমি ওকে বাসার চাবি দিলাম। আফরিন বাসায় চলে গেল।

তার কণ্ঠে ক্লান্তি।

— যাবার সময় শুধু বললাম, “তোমার আপার সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে, তাই সকালে রান্না হয়নি।”

আমার বুকটা কেমন যেন হালকা কেঁপে উঠল।

তাজুল বলল,

— তখন আফরিন হেসে বললো, “ঠিক আছে দুলাভাই, আমি তাহলে বাসায় গিয়ে রান্না করে রাখবো। আপনি খেতে চলে আসবেন দুপুরে।”

আমি তাজুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তারপর সে আবার বলল,

— তখন আমি বললাম, “সমস্যা নেই, তুমি রান্না করে খেয়ে নিও। আমি বরং আজ হোটেলে খাবো।”

তাজুলের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।

— কিন্তু আফরিন বললো, “তা কি করে হয় দুলাভাই। আপনার অফিস থেকে তো কাছেই। আপনি বাসায় চলে যাবেন।”

তাজুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— দেড়টার দিকে আমি অফিস থেকে বের হলাম।

তার চোখে যেন সেই মুহূর্তগুলো আবার ফিরে এসেছে।

— কারণ এর আগে তিনবার কল করেছে আফরিন।

আমি অস্থির হয়ে উঠলাম।

— তারপর?

তাজুল বলল,

— রেললাইন পার হয়ে আমি আফরিনের নাম্বারে কল দিলাম।

— রিসিভ করেছিল?

— না।

তার কণ্ঠে অদ্ভুত শূন্যতা।

— আফরিন কল রিসিভ করলো না।

আমি ধীরে বললাম,

— তারপর?

তাজুল বলল,

— রেললাইনের পাশের বাজার থেকে দুই কেজি দই কিনলাম।

আমি অবাক হয়ে তাকালাম।

তাজুল ধীরে বলল,

— তুমি পরশু বলেছিলে দই কিনতে।

মুহূর্তের জন্য আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

এত বড় একটা বিপদের মধ্যেও সে আমার বলা একটা ছোট কথাও ভুলে যায়নি।

তাজুল বলছিল,

— দই কিনে আমি বাসায় গেলাম।

তার কণ্ঠ হঠাৎ থেমে গেল।

আমি ধীরে বললাম,

— তারপর?

তাজুলের ঠোঁট কাঁপছিল।

— বাসার দরজা আধখোলা ছিল।

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।

— আমি ভেবেছিলাম হয়তো আফরিন রান্না করছে।

তার চোখে আতঙ্ক ভেসে উঠল।

— কিন্তু ভেতরে ঢুকেই দেখি…

সে বাকিটা বলতে পারছিল না।

আমি প্রায় ফিসফিস করে বললাম,

— কী দেখলে?

তাজুলের চোখ ভিজে উঠল।

— রান্নাঘরে চুলা জ্বলছিল… কিন্তু আফরিন নেই।

আমার বুক ধকধক করতে লাগল।

তাজুল বলল,

— আমি ড্রইংরুমে গেলাম… তারপর তোমার রুমে।

তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।

— আর তারপর…

আমি প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

তাজুল ফিসফিস করে বলল,

— আফরিন মেঝেতে পড়ে ছিল।

আমার পৃথিবী যেন হঠাৎ থেমে গেল।

চারপাশের শব্দ মিলিয়ে গেল।

শুধু একটা প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল—

আমার ছোট বোন…

আফরিন…

তার কী হয়েছে?

আর কে করলো এই সর্বনাশ?

তাজুল মাথা নিচু করে বলল,

— মিতু… পুলিশ বলছে ঘটনাটা খুব জটিল।

আমার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।

মনে হচ্ছিল—গত রাতের সেই একটা থাপ্পর যেন শুধু আমাদের সম্পর্কেই নয়…

আমাদের জীবনের ভেতরেও এক অদৃশ্য ঝড় ডেকে এনেছে।

চলবে…