ঢাকা, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৯:২৬:১৬ PM

উপন্যাস: জটিল

মান্নান মারুফ
06-03-2026 12:15:58 PM
উপন্যাস: জটিল

পর্ব–৩

হঠাৎ কে যেন ডাকছে। চেয়ে দেখে আয়া।
আয়া এসে ধীরে বলে উঠল,
— আপা, রিসিপশন ডেস্ক থেকে টেলিফোনে কল দিয়ে বললো, “আপনার সঙ্গে দেখা করতে এক ভদ্রলোক এসেছে।”

মিতু একটু ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
— কে? নাম বলেছে?

— না আপা, শুধু বলেছে আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

কিছুটা অনিচ্ছা, কিছুটা কৌতূহল নিয়ে মিতু বলল,
— ঠিক আছে, তাকে ভিতরে পাঠাও।

কিছুক্ষণ পর দরজাটা ধীরে খুলে গেল।
দরজার ফাঁক দিয়ে যে মানুষটা ভিতরে ঢুকলো, তাকে দেখে মিতুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো।

তাজুল।

হ্যাঁ, তাজুল ছাড়া আর কেউ নয়।

তাজুল কখনো মিতুর অফিসে আসেনি। এমনকি মিতুর কর্মস্থলের ঠিকানা পর্যন্ত ঠিকমতো জানত কি না সেটাও সন্দেহ ছিল। অথচ আজ সে এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক মিতুর অফিস রুমের দরজায়।

মিতু কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল।

তাজুলের চেহারাটা আজ কেমন যেন বদলে গেছে।
ঘেমে জবজবে শরীর।
শার্টটা কাঁধে কুঁচকে আছে।
মুখে এক ধরনের ভয়, উৎকণ্ঠা আর অপরাধবোধের ছাপ।

গত রাতের ঘটনাটা হঠাৎ করেই মিতুর মাথায় ফিরে এলো।

একটা থাপ্পর।

শব্দটা যেন আবারও কানে বাজতে লাগল।
যে মানুষটা তাকে কোনোদিন কটু কথা পর্যন্ত বলেনি, সেই মানুষটাই গত রাতে রাগের মাথায় তাকে থাপ্পর মেরেছিল।

মিতুর বুকের ভেতরটা আবার ভারী হয়ে উঠল।

কিন্তু তাজুলের এই অবস্থা দেখে মনে হলো না যে সে শুধু সেই ঝগড়ার জন্য এসেছে।

কিছু একটা ঘটেছে।

মিতু চেয়ার থেকে একটু সোজা হয়ে বসে বলল,
— বললাম, কী হয়েছে? এভাবে ঘামছো কেন? আর তুমি এ সময় তোমার অফিসে না গিয়ে এখানে কেন আসছো?

তাজুল কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে সামনে থাকা চেয়ারটায় বসে পড়ল।

তার হাত দুটো কাঁপছে।

মিতু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটা সাধারণত খুব স্থির। খুব কমই তাকে এতটা অস্থির দেখা যায়।

— মিতু… একটা বড় বিপদ হয়ে গেছে।

তাজুলের কণ্ঠস্বরটা যেন শুকিয়ে গেছে।

— কী বিপদ?

— আমি… আমি জানি না কীভাবে বলবো।

মিতুর ভেতরে অজানা আশঙ্কা জন্ম নিল।

— সরাসরি বলো তাজুল।

তাজুল মাথা নিচু করে বলল,
— আব্বা খুব অসুস্থ।

মিতুর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

— কী বলো! কখন?

— আজ সকালে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।

মিতুর বুকটা ধক করে উঠল।

— এখন কোথায়?

— হাসপাতালে। ডাক্তার বলেছে অবস্থা ভালো না।

মিতু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

গত রাতের রাগ, অভিমান, অপমান—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে ঝাপসা হয়ে গেল।

মানুষের জীবন কখন যে কোন দিকে মোড় নেয়, কেউ জানে না।

মিতু ধীরে বলল,
— তাহলে তুমি এখানে কেন এসেছো? তোমার তো এখন হাসপাতালে থাকা উচিত।

তাজুল মাথা তুলল।

তার চোখ দুটো লাল।

— আমি তোমাকে না বলে থাকতে পারলাম না।

মিতু অবাক হয়ে তাকালো।

— কেন?

তাজুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— গত রাতের জন্য।

রুমের ভেতরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

তাজুলের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

— আমি জানি না কীভাবে আমার হাত উঠেছিল। আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি।

মিতু চুপ করে শুনছিল।

তাজুল বলল,
— আজ সকালে যখন আব্বাকে ওই অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন শুধু একটা কথাই মাথায় ঘুরছিল— যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমি সারাজীবন এই অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচবো।

— কোন অপরাধবোধ?

— তোমাকে থাপ্পর মারার অপরাধবোধ।

মিতুর চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল।

তাজুল ধীরে বলল,
— আমি কখনো চাইনি তোমাকে কষ্ট দিতে। কিন্তু গতকাল অফিসের চাপ, টেনশন… সবকিছু মিলিয়ে মাথা কাজ করছিল না।

— তাই বলে হাত তুলবে?

মিতুর কণ্ঠে চাপা কষ্ট।

তাজুল মাথা নিচু করল।

— না, তবুও আমার হাত তোলা উচিত হয়নি।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

বাইরে অফিসের করিডোরে মানুষের পায়ের শব্দ ভেসে আসছিল।

মিতু জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে পড়তে লাগল তাদের বিয়ের প্রথম দিকের দিনগুলো।

তাজুল তখন কত যত্ন করত।

এক কাপ চা পর্যন্ত তাকে বানাতে দিত না।

আর আজ…

একটা থাপ্পর।

মিতু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— এখন তোমার আব্বার কাছে যাও তাজুল।

তাজুল অবাক হয়ে তাকালো।

— তুমি… তুমি আমার সঙ্গে যাবে?

মিতু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তার মনে এখনো গত রাতের অপমানটা কাঁটার মতো বিঁধে আছে।

কিন্তু তবুও…

মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে যেখানে অভিমান বড় নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানো বড়।

মিতু ধীরে বলল,
— চল।

তাজুল যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।

— সত্যি?

মিতু হালকা কণ্ঠে বলল,
— এখন এসব ভাবার সময় না।

তাজুলের চোখ ভিজে উঠল।

সে ধীরে বলল,
— আমি জানতাম… তুমি আমাকে এভাবে একা ছেড়ে দেবে না।

মিতু কোনো উত্তর দিল না।

শুধু ব্যাগটা তুলে নিল।

দুজন একসাথে রুম থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল।

কিন্তু মিতুর বুকের ভেতরে তখনো একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—

একটা থাপ্পর কি সত্যিই এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়?

নাকি সেই শব্দটা মানুষের মনে সারাজীবন প্রতিধ্বনির মতো বাজতেই থাকে?

উত্তরটা হয়তো সময়ই দেবে।

চলবে…