শেষ পর্ব
বহু দিন হয়ে গেল।
ঋতু বদলেছে, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, শহরের রঙ বদলেছে—কিন্তু ঐশির ভেতরের একটি সময় যেন একই জায়গায় থেমে আছে।
রাত আড়াইটা হলেই সেই থেমে থাকা সময়টা আবার জেগে ওঠে।
মানুষ বলে, সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়।
মানুষ চাইলে সব ভুলতে পারে।
কিন্তু ঐশি বুঝেছে—সব ভুলে যাওয়া যায় না। কিছু জিনিস ভুলতে চাইলেও মনে থেকে যায়। প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি নির্জন মুহূর্তে।
হ্যারিকে সে ভুলতে পারেনি।
এখন আর প্রতিদিন কথা হয় না।
মেসেজ আসে না।
ভিডিও কলের স্ক্রিনে আর দেখা যায় না সেই চেনা মুখ।
তবু রাত আড়াইটায় মনে পড়ে—
হোটেলের সেই লবি, অন্যমনস্ক চোখ, কাঁপা কণ্ঠে বলা প্রতিশ্রুতি।
মনে পড়ে বিদায়ের মুহূর্ত, বিমানবন্দরের কাচের দরজার ওপারে মিলিয়ে যাওয়া এক ছায়া।
ঐশি এখন আগের চেয়ে অনেক শান্ত।
বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝবে না তার ভেতরে কত ঝড় বয়ে গেছে।
সে পড়াশোনায় মন দিয়েছে, সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করে, বাবার পাশে বসে খবরের কাগজের আলোচনা শোনে। জীবন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলছে।
কিন্তু কিছু জিনিস সত্যিই ভোলা যায় না।
রাত আড়াইটা বাজলেই সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
শীতের রাতে কুয়াশা, গ্রীষ্মে নিস্তব্ধ গরম, বর্ষায় টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ—সব ঋতুতেই এই সময়টা একই রকম ভারী।
সে ভাবে—এই মুহূর্তে কি দূরে কোথাও, অন্য এক আকাশের নিচে হ্যারিও জেগে আছে?
তার শহর—Berlin—এখন হয়তো সন্ধ্যা, হয়তো বিকেল।
সেই শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কি কখনো তার মনে পড়ে ঐশির কথা?
প্রশ্নগুলো উত্তর চায় না।
শুধু বুকে একটা চাপা ব্যথা জাগায়।
একদিন মা বললেন,
—“মা, অতীত নিয়ে এত ভাবিস না। নতুন করে জীবন শুরু কর।”
ঐশি মৃদু হেসে মাথা নেড়েছিল।
নতুন করে শুরু করা কি এত সহজ?
সে জানে, বাবা-মা ভুল বলেননি। তারা চেয়েছেন তার নিরাপত্তা, তার স্থির ভবিষ্যৎ।
কিন্তু হৃদয়ের ভাঙা অংশগুলো কি যুক্তির কথায় জোড়া লাগে?
কখনো কখনো সে নিজের ওপর রাগ করে।
কেন এতটা জড়িয়ে পড়েছিল?
কেন এত বিশ্বাস করেছিল?
তারপর আবার মনে পড়ে—ভালোবাসা তো হিসাব কষে আসে না।
ভালোবাসা আসে নিঃশব্দে, গভীরভাবে, অপ্রস্তুত করে।
হ্যারির সঙ্গে কাটানো সময় খুব বেশি ছিল না।
কিন্তু সেই অল্প সময়েই সে অনুভব করেছিল এক অন্যরকম ভরসা।
হয়তো সেই ভরসাটাই আজও তাকে ছাড়ে না।
এক রাতে, ঠিক আড়াইটা বাজতে না বাজতেই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“Hope you are well.”
মাত্র তিনটি শব্দ।
নাম লেখা নেই।
কিন্তু ঐশি জানত—এটা কার।
তার বুকের ভেতর পুরোনো ঝড়টা আবার জেগে উঠল।
হাত কাঁপতে লাগল।
উত্তর দেবে?
নাকি নীরব থাকবে?
সে অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে টাইপ করল—
“I am fine. I hope you are too.”
এই ছোট্ট বিনিময়েই আবার খুলে গেল পুরোনো দরজা।
হ্যারি লিখল—
“I tried. Things didn’t work as planned.”
ঐশির চোখে জল এসে গেল।
সে জানে—সব চেষ্টা সফল হয় না।
সব পরিকল্পনা বাস্তবের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়ে।
কিন্তু ব্যথা কি কমে?
সে লিখল না আর কিছু।
কারণ বুঝে গেছে—কিছু সম্পর্কের শেষ শব্দ থাকা দরকার। নইলে তারা বারবার ফিরে এসে কষ্ট দেয়।
রাত আড়াইটা পেরিয়ে তিনটা বাজল।
ঐশি জানালার পাশে বসে ভাবল—
ভালোবাসা মানে কি শুধু একসাথে থাকা?
নাকি ভালোবাসা মানে কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়া?
সে জানে, হ্যারি তার জীবনে এক অধ্যায়।
অপূর্ণ, অসমাপ্ত, তবু গভীর।
অনেকেই এখন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।
পরিবার চায় সে নতুন জীবন শুরু করুক।
সে রাজি হয়, হাসে, কথা বলে—কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা শূন্যতা থেকে যায়।
তবু সে আগের মতো আর ভেঙে পড়ে না।
সে শিখেছে—ব্যথা নিয়ে বাঁচা যায়।
স্মৃতি নিয়ে হাঁটা যায়।
একদিন বাবা তার পাশে বসে বললেন,
—“জীবনে সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। কিন্তু মানুষ থেমে থাকলে চলে না।”
ঐশি বাবার হাত ধরল।
—“আমি থামিনি, আব্বু। শুধু একটু ধীরে হাঁটছি।”
রাত আড়াইটা আবার এলো।
আজ তার মনে কষ্ট আছে, কিন্তু অভিযোগ নেই।
ভালোবাসা ছিল—সত্যি ছিল।
সময়, বাস্তব, পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে সেই ভালোবাসা রূপ বদলেছে।
এখন তা আর দাবি করে না।
শুধু নীরব স্মৃতি হয়ে পাশে থাকে।
ঐশি জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তার চোখে জল নেই।
সে মনে মনে বলল—
“আমি তোমাকে ভুলিনি। কিন্তু আমি আটকে নেই।”
রাত আড়াইটা আর শুধু ব্যথার সময় নয়—
এটা তার শক্তির সময়।
এই সময়েই সে নিজেকে মনে করিয়ে দেয়—
ভালোবাসা হারালেও মানুষ বেঁচে থাকে।
ভাঙলেও মানুষ আবার গড়ে ওঠে।
দূরের আকাশে এক টুকরো তারা জ্বলছে।
ঐশি জানে না সেই আলো কোন দিক থেকে আসে।
কিন্তু সে জানে—অন্ধকার যত গভীরই হোক, কোথাও না কোথাও আলো থাকে।
বহু দিন হয়ে গেছে।
হ্যারি’কে ভোলা হয়নি।
হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি ভোলা যাবে না।
কিন্তু এখন সেই স্মৃতি তাকে ভাঙে না—
শুধু মনে করিয়ে দেয়,
একসময় রাত আড়াইটায় কেউ ছিল,
যে তাকে ভালোবেসেছিল।
আর আজ—
রাত আড়াইটা তাকে শেখায়,
নিজেকেও ভালোবাসতে হয়।