ঢাকা, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:২৫:৩৫ PM

উপন্যাস: রাত আড়াইটা

মান্নান মারুফ
02-03-2026 02:10:24 PM
উপন্যাস: রাত আড়াইটা

পর্ব–৮

আজ সেই দিন।
যে দিনটির জন্য এত অপেক্ষা, এত ভয়, এত প্রার্থনা—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দিয়েছে।

সকাল থেকেই ঐশির বুকের ভেতর কেমন যেন ধুকপুক করছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে মনে হচ্ছিল—আজ কি তার জীবনের মোড় ঘুরে যাবে? নাকি ভেঙে যাবে সব স্বপ্ন?

বিদেশি জার্মানির ছেলে—তার হ্যারি—আজ বাংলাদেশে আসবে।

বিমানবন্দরের পথে যেতে যেতে শহরটাকে নতুন মনে হচ্ছিল। রিকশার টুংটাং শব্দ, রাস্তার ধুলা, ভিড়, মানুষের কোলাহল—সব যেন হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই শহরেই তো তার শিকড়। আর সেই শিকড়ে আজ এসে দাঁড়াবে দূরদেশের একজন মানুষ।

বিমান নামল।
মানুষ বেরিয়ে আসছে একে একে।
হঠাৎই ঐশির চোখ থেমে গেল—ওই তো!
লম্বা গড়ন, হালকা দাড়ি, কাঁধে ব্যাগ—হ্যারি।

হ্যারি—Harry Schneider—যাকে সে এতদিন শুধু স্ক্রিনে দেখেছে, আজ সে বাস্তবে সামনে দাঁড়িয়ে।

কিন্তু…
কেন যেন তাকে অন্যমনস্ক লাগছিল। চোখে ক্লান্তি, মুখে চাপা চিন্তা।

ঐশি এগিয়ে গেল।
তাদের চোখে চোখ পড়ল।
এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল।

হ্যারি হালকা হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে আগের উচ্ছ্বাস নেই।
সে শুধু বলল,
—“Hi…”

ঐশির বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা তৈরি হলো।

পরে তারা শহরের একটি হোটেলে দেখা করল।
লবিতে বসে দুজন মুখোমুখি। চারপাশে অপরিচিত মানুষ, অচেনা গন্ধ, আর ভেতরে জমে থাকা হাজারো প্রশ্ন।

হ্যারি চুপ।
ঐশি চুপ।

এই নীরবতা যেন শব্দের চেয়েও ভারী।

অবশেষে ঐশি বলল,
—“তুমি ঠিক আছো?”

হ্যারি একটু সময় নিল।
—“আমি ঠিক আছি। শুধু… অনেক কিছু ভাবছি।”

তার চোখে দূরত্বের ছায়া।
ঐশির বুক ধক করে উঠল—এই কি সেই মানুষ, যে এত সাহসী কথা বলত? যে বলেছিল, “আমি প্রমাণ করতে আসছি যে আমি সত্যি”?

কিছুক্ষণ পর তারা কথা শুরু করল।
কিভাবে ঐশির বাবার কাছে যাবে?
কি বলবে?
কোন ভাষায় নিজেদের সত্যিটা তুলে ধরবে?

হ্যারি বলল,
—“আমি তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমি বলতে চাই আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”

ঐশির চোখ ভিজে উঠল।
—“কিন্তু আব্বু বলেছে… তোমাকে মুসলিম হতে হবে।”

হ্যারি চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—“আমি মুসলিম হতে রাজি।”

শব্দগুলো শুনে ঐশির শরীর কেঁপে উঠল।
সে কি ঠিক শুনেছে?

—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ। আমি অনেক ভেবেছি। ধর্ম আমার কাছে বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু যদি তোমার পরিবার আমাকে গ্রহণ করতে এর প্রয়োজন হয়, আমি প্রস্তুত।”

ঐশির চোখে জল নেমে এলো।
কিন্তু আনন্দের ভেতরেও অদ্ভুত এক ভয়।

হ্যারি আবার বলল,
—“আর একটা কথা… আমি জার্মানিতে ফিরে যেতে চাই না। আমি বাংলাদেশে থাকতে চাই।”

এই কথায় যেন চারপাশের বাতাস থমকে গেল।

—“কি?”
—“হ্যাঁ। আমি এখানে থাকতে চাই। তোমার দেশে, তোমার শহরে। আমি চেষ্টা করব এখানেই কিছু শুরু করতে।”

ঐশি নির্বাক।
এই কথার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।

বাংলাদেশ—তার প্রিয় দেশ।
কিন্তু এখানে থাকা কি এত সহজ?

হ্যারি জার্মানির নাগরিক।
তার শহর—Berlin—তার জীবন, কাজ, পরিচয়—সব সেখানে।
এখানে তার কোনো নাগরিকত্ব নেই, নেই ব্যবসা-বাণিজ্য, নেই কোনো স্থায়ী পরিচয়।

ঐশির মাথায় একের পর এক প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।
ভিসা?
ওয়ার্ক পারমিট?
আইনগত জটিলতা?
সমাজের প্রশ্ন?

সে ধীরে বলল,
—“তুমি কি জানো, এখানে থাকা কত কঠিন হতে পারে?”

হ্যারি মাথা নেড়ে বলল,
—“আমি জানি না সব। কিন্তু আমি চেষ্টা করতে চাই।”

চেষ্টা—এই শব্দটাই কি যথেষ্ট?

হোটেলের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ঐশি দেখল ব্যস্ত রাস্তা।
মানুষ ছুটছে, গাড়ি ছুটছে।
এই শহর কাউকে সহজে জায়গা দেয় না।

তার মনে হলো—ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, বাস্তবও আছে।
কাগজপত্র, আইন, অর্থ—সব মিলিয়ে এক কঠিন সমীকরণ।

—“আর যদি না পারো?”
ঐশির কণ্ঠ কাঁপল।
—“তাহলে?”

হ্যারি চুপ।
তার চোখে অনিশ্চয়তা।

এই অনিশ্চয়তাই ঐশিকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়।

তারা অনেকক্ষণ বসে রইল।
পরিকল্পনা করল—কিভাবে বাবার সঙ্গে কথা বলবে।
হ্যারি ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে কীভাবে ব্যাখ্যা দেবে।
কীভাবে প্রমাণ করবে সে কোনো স্বার্থ নিয়ে আসেনি।

কিন্তু কথার ফাঁকে ফাঁকে স্পষ্ট হয়ে উঠল—ভবিষ্যৎ ঝাপসা।

ঐশি হঠাৎ বুঝল—সে শুধু একজন প্রেমিকা নয়, সে একজন কন্যা, একজন নাগরিক, একজন দায়িত্বশীল মানুষ। তার সিদ্ধান্ত শুধু দুজনের নয়, দুই পরিবারের, দুই সংস্কৃতির।

রাত নেমে এলো।
আবার সেই সময়—রাত আড়াইটা।

হোটেলের ঘরে ফিরে ঐশি একা জানালার পাশে দাঁড়াল। শহরের আলো ঝাপসা। তার চোখও ঝাপসা।

সে ভাবল—এই কি সেই মুহূর্ত, যার জন্য এতদিন অপেক্ষা?

হ্যারি পাশের ঘরে।
কিন্তু তাদের মাঝে যেন দূরত্ব তৈরি হয়েছে—বাস্তবতার দূরত্ব।

ভালোবাসা আছে।
কিন্তু সেই ভালোবাসাকে টিকিয়ে রাখতে কত লড়াই!

ঐশি মনে মনে হিসাব করতে লাগল—
যদি হ্যারি এখানে থাকে, কী করবে?
চাকরি পাবে?
মানুষ তাকে গ্রহণ করবে?
তার পরিবার কি রাজি হবে?

হঠাৎ তার মনে হলো—ভালোবাসা যেন এক নৌকা। তারা দুজন মাঝনদীতে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে স্রোত, ঝড়, অনিশ্চয়তা। তবু হাত ছাড়তে পারছে না।

হ্যারি দরজায় নক করল।
—“Can we talk?”

ঐশি দরজা খুলল।

হ্যারি বলল,
—“আমি ভয় পাচ্ছি। কিন্তু তোমাকে হারাতে চাই না।”

ঐশি ধীরে বলল,
—“আমিও ভয় পাচ্ছি। কিন্তু শুধু ভয় দিয়ে তো জীবন চলে না।”

দুজন কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

এই শহর, এই দেশ, এই সমাজ—সব তাদের সামনে প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে।

তবু আজ একটা সত্য স্পষ্ট—
হ্যারি মুসলিম হতে রাজি।
বাংলাদেশে থাকতে চায়।
কিন্তু পথটা কঠিন।

রাত আড়াইটা আবার সাক্ষী রইল—
ভালোবাসা কি শুধু আবেগে টিকে থাকে?
নাকি বাস্তবের কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে হয়?

ঐশি জানে না সামনে কী আছে।
শুধু জানে—এখন আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই।

ভোর আসবে।
তাদের যেতে হবে তার বাবার কাছে।
বলতে হবে সত্যি কথা।

আর সেই কথার ভেতরেই হয়তো নির্ধারিত হবে—
তাদের ভালোবাসা কি এই মাটিতে শেকড় গাঁথতে পারবে,
নাকি কাগজপত্র আর সমাজের দেয়ালে আটকে যাবে চিরদিনের মতো।

 চলবে............