ঢাকা, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:২৫:৩৬ PM

উপন্যাস: রাত আড়াইটা

মান্নান মারুফ
02-03-2026 02:04:31 PM
উপন্যাস: রাত আড়াইটা

পর্ব–৭

রাত আবার আড়াইটা ছুঁয়েছে।
এই সময়টাতে যেন পৃথিবী থেমে যায়, কিন্তু মানুষের ভেতরের অস্থিরতা থামে না।

ঐশি বিছানায় বসে আছে, জানালার পর্দা অল্প সরানো। দূরের অন্ধকার আকাশে কুয়াশার পর্দা। চারদিক এত নীরব, অথচ তার বুকের ভেতরটা তুমুল শব্দে কাঁপছে। সে জানে—তার বাবা এই সমাজে একজন সম্মানিত মানুষ। কথায়, কাজে, ব্যবহারে তিনি সবসময় মাথা উঁচু করে চলেছেন। সেই সম্মানে যদি কোনো আঁচ লাগে? যদি মানুষ আঙুল তোলে?

এই ভয়ই তাকে গিলে খাচ্ছে।

সে ভাবতে পারছে না—ঠিক কী হচ্ছে তার জীবনে। কয়েক মাস আগেও জীবন ছিল স্বাভাবিক। পড়াশোনা, পরিবার, ছোট ছোট স্বপ্ন। আর এখন—এক বিদেশি ছেলে আসছে তাকে বিয়ে করার জন্য।
এক অজানা দেশ, অজানা ভবিষ্যৎ।

মনের ভেতর এক অদ্ভুত শঙ্কা বাসা বাঁধছে।
বিদেশি ছেলে বাংলাদেশে আসবে—মানুষ কী বলবে? যদি কেউ ভুল বোঝে? যদি কেউ অপবাদ দেয়? যদি সমাজ ভাবে, তারা টাকার লোভে মেয়েকে বিদেশে পাঠাতে চায়?

তার কানে ভেসে আসে পাশের বাড়ির আন্টির গলা—
“এই সময়কার মেয়েরা তো সুযোগ পেলেই বিদেশে পালায়!”

ঐশি চোখ বন্ধ করে। সে কি পালাতে চাইছে?
না। সে শুধু ভালোবাসতে চেয়েছে।

কিন্তু ভালোবাসা আর মান-সম্মানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকাটা কতটা কঠিন—তা সে এখন বুঝতে পারছে।

আরেকটা ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়—
যদি সত্যিই বিয়ে হয়ে যায়? সে কি সুখী হবে?
হ্যারি কি তাকে সত্যি আগলে রাখবে?
ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম—সবকিছু এত আলাদা। সেখানে গিয়ে সে কি একা হয়ে যাবে না?

মাঝরাতে হঠাৎ মনে হয়—সে যেন নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।

দিন যায়। টেনশন বাড়ে।
বাবা বাইরে গেলে লোকজনের সঙ্গে আগের মতোই হাসিমুখে কথা বলেন। কিন্তু বাড়িতে ফিরলে তার চেহারায় এক চাপা উদ্বেগ স্পষ্ট। মা মাঝেমধ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

এই নীরব চাপা দুঃখটাই ঐশির সবচেয়ে কষ্ট দেয়।

একদিন সন্ধ্যায় ফোন এল।
হ্যারি জানাল—ডেট ফিক্স হয়েছে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সে বাংলাদেশে আসছে।

শব্দগুলো শোনার পর ঐশির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। ডিসেম্বর—মানে আর বেশি দিন নেই। সময় যেন হঠাৎ দ্রুত ছুটতে শুরু করল।

সে ফোন রেখে অনেকক্ষণ বসে রইল। বাইরে শীতের হাওয়া বইছে। ডিসেম্বর মানেই কুয়াশা, শীত, আর অদ্ভুত এক নীরবতা। সেই নীরবতার ভেতরেই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত আসবে।

রাতে খাবার টেবিলে বাবা বললেন,
—“শুনলাম ও ডিসেম্বরেই আসছে?”

ঐশি ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—“জি।”

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
—“দেখ, আমরা কারও ক্ষতি চাই না। কিন্তু আমাদের মান-সম্মানটাই বড়। যদি দেখি সবকিছু ঠিক আছে, তাহলে ভাবব। কিন্তু কোনো তাড়াহুড়া হবে না।”

ঐশি বুঝতে পারে—বাবা শুধু সমাজের কথা ভাবছেন না, তার ভবিষ্যতের কথাও ভাবছেন। কিন্তু সমাজের ভয়টাই যেন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সে নিজের ঘরে ফিরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
নিজেকে দেখে মনে হলো—এই মেয়েটা কে?
সে কি সেই আগের ঐশি?
নাকি এক অজানা ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভীত কন্যা?

তার মনে পড়ে যায় কত গল্প শুনেছে—বিদেশ থেকে ছেলেরা এসে বিয়ে করে নিয়ে গেছে মেয়েদের। কেউ সুখী হয়েছে, কেউ হারিয়ে গেছে অচেনা জীবনে। কেউ আর কোনোদিন ফিরে আসেনি।

এই ভাবনাগুলো তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে থাকে।

তবু মনের আরেক কোণে একটুখানি সাহস জন্মায়।
সে ভাবে—অনেক দেশ থেকে মানুষ আমাদের দেশে আসে, বিয়ে করে, সংসার গড়ে। সবাই তো খারাপ নয়। হয়তো তার গল্পটা অন্যরকম হবে।

হ্যারি মাঝে মাঝে ভিডিও কলে শহরের রাস্তা দেখায়।
তুষারে ঢাকা পথ, আলোকিত স্কয়ার, বড়দিনের সাজসজ্জা। ঐশি শুনেছে, সেই সময় ইউরোপে উৎসবের আমেজ থাকে।
হ্যারির শহর—Berlin—ডিসেম্বরে নাকি আলোর শহরে পরিণত হয়।

ঐশি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভাবে—সেই আলোর শহরে সে কি জায়গা পাবে?
নাকি অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে?

হ্যারি বলেছিল,
—“আমি কাউকে প্রমাণ করতে আসছি না। আমি শুধু তোমাকে প্রমাণ করতে আসছি যে আমি সত্যি।”

এই কথাটা তার মনে গেঁথে আছে।
তবু ভয় যায় না।

একদিন রাত আড়াইটা।
ঐশি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। শীতের কুয়াশা জমেছে। দূরে মসজিদের মিনার অন্ধকারে ঝাপসা।

তার মনে হলো—এই আড়াইটা সময়টাই তার জীবনের সাক্ষী।
প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যেন এই সময়েই এসে দাঁড়ায়।

সে ফিসফিস করে বলে,
“আমি কি ভুল করছি?”

কেউ উত্তর দেয় না।
শুধু দূরের ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়—যেন কোনো অজানা যাত্রার আহ্বান।

ডিসেম্বর ঘনিয়ে আসে।
পাসপোর্ট, ভিসা, ফ্লাইট—সবকিছু নিয়ে কথা হচ্ছে। আত্মীয়স্বজন কেউ জানে, কেউ জানে না। যারা জানে, তারা কৌতূহলী চোখে তাকায়। কেউ সহানুভূতি দেখায়, কেউ সন্দেহ।

ঐশির মনে হয়—সে যেন এক প্রদর্শনীর বস্তু।
তার ভালোবাসা, তার ভয়, তার স্বপ্ন—সবকিছু যেন বিচারাধীন।

মাঝে মাঝে সে ভাবে—যদি হ্যারি না আসত?
তাহলে হয়তো জীবন সহজ থাকত।
কিন্তু সহজ জীবন কি সত্যিই সুখের?

তার ভেতরে আবার প্রশ্ন জাগে—
সে কি সত্যিই হ্যারিকে ছাড়া থাকতে পারবে?

উত্তর আসে—না।

এই “না”-ই তাকে টিকিয়ে রাখে।
এই “না”-ই তাকে সাহস দেয়।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ।
শীত নেমে গেছে পুরোপুরি।
ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখগুলো যেন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

এক রাতে হ্যারি মেসেজ দিল—
“See you soon.”

ঐশির বুক কেঁপে উঠল।
সত্যিই কি “soon”?

রাত আড়াইটা বাজে।
ঘড়ির শব্দ যেন আরও স্পষ্ট।

ঐশি জানালার পাশে বসে থাকে।
তার মনে হয়—এই রাতের মতোই তার ভবিষ্যৎও কুয়াশাচ্ছন্ন। সামনে কী আছে, স্পষ্ট দেখা যায় না। তবু ভোর আসবেই।

সে নিজের বুকের ওপর হাত রাখে।
হৃদস্পন্দন দ্রুত।

হয়তো এই ভয়ই প্রমাণ—সে এখনও বেঁচে আছে, এখনও ভালোবাসে, এখনও স্বপ্ন দেখে।

ডিসেম্বরের সেই দিনটি আসবে।
বিদেশি ছেলে বাংলাদেশে নামবে।
সমাজ তাকিয়ে থাকবে।
বাবা দৃঢ় হয়ে দাঁড়াবেন।
আর ঐশি—সে দাঁড়াবে মাঝখানে, ভালোবাসা আর সম্মানের ভার কাঁধে নিয়ে।

রাত আড়াইটা আবার সাক্ষী হবে—
ভয় কি জয় পাবে,
নাকি ভালোবাসা তার নিজের আলো খুঁজে নেবে?

কুয়াশার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল।
ঐশি জানে না সামনে কী আছে।
তবু সে জানে—এই পথ থেকে আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই।

 চলবে........