পর্ব–৪
রাত আড়াইটা। এই সময়টা এখন আর শুধু সময় নয়—ঐশির জীবনের প্রতিটি মোড়ের নীরব সাক্ষী।
হ্যারি বিয়ে করবে—এই কথাটা শোনার পর ঐশি যেন নতুন এক আকাশ খুঁজে পেয়েছিল। তার চোখে ভেসে উঠছিল অপরিচিত শহরের ঝকঝকে রাস্তা, রঙিন ট্রামলাইন, তুষার ঢাকা সকাল। সে কল্পনা করছিল—জার্মানির কোনো সাজানো-গোছানো শহরে তার নতুন জীবন। পরিপাটি বাড়ি, পরিস্কার বাতাস, সুগন্ধি কফির কাপ হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক নতুন ঐশি।
বাংলাদেশের ভাঙা রাস্তা, ধুলোমাখা দুপুর, মানুষের কটূকথা—সবকিছু থেকে মুক্তি।
সে মনে মনে বলেছিল, “আমি চলে যাবো। নতুন করে বাঁচবো।”
হ্যারির কথাগুলো তার কানে গেঁথে ছিল—
“তুমি আমার স্ত্রী হবে। আমি তোমাকে সুখে রাখবো।”
সুখ—শব্দটা তার কাছে এতদিন ছিল দূরের কোনো স্বপ্ন। এখন মনে হচ্ছিল, সে যেন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবে।
ঐশি ভাবতে শুরু করল—জার্মানিতে গেলে তার জীবন কত সুন্দর হবে!
সেখানে নাকি সবকিছু নিয়মমাফিক চলে। পরিবেশ পরিষ্কার, মানুষ শিক্ষিত, জীবন সচ্ছল। তার আর কষ্ট থাকবে না। টাকার জন্য চিন্তা করতে হবে না। নিজের মতো পোশাক পরবে, নিজের মতো চলবে।
এইসব কল্পনায় সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠেছিল।
বন্ধুদের সাথে কথা বলার সময়ও তার চোখে এক ধরনের ঝিলিক ফুটে উঠছিল। যদিও সে কাউকে কিছু বলেনি, তবুও তার ভেতরের উত্তেজনা লুকানো যাচ্ছিল না।
কিন্তু সুখের এই কল্পনার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য ছায়া।
হ্যারি বলেছিল, সে দ্রুত আসবে। বিয়ের প্রস্তুতিও নেবে।
ঐশি মাঝে মাঝে সাহস করে জিজ্ঞেস করত,
“তোমার পরিবার কী বলছে?”
হ্যারি উত্তর দিত,
“ওরা বুঝবে। আমি তোমার জন্য সব করতে পারি।”
কথাগুলো শুনতে ভালো লাগত। কিন্তু তার ভেতরে কোথাও একটা অস্বস্তি রয়ে যেত।
সবকিছু এত সহজে হয়?
একদিন গভীর রাতে, আবারও আড়াইটায়, হ্যারি ফোন করল।
কণ্ঠে আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই। কিছুটা চাপা স্বর।
“একটা বিষয় আছে,” সে বলল।
ঐশির বুক ধক করে উঠল।
“কী বিষয়?”
“বিয়ের আগে কিছু কাগজপত্র লাগবে। কিছু প্রসেস আছে। আর কিছু খরচও আছে… তুমি একটু হেল্প করতে পারবে?”
ঐশি চুপ করে গেল।
“আমি?”
“হ্যাঁ। ভিসা, ডকুমেন্ট, ট্রাভেল—সব মিলিয়ে অনেক খরচ। আমি অনেকটা করছি, কিন্তু কিছু অংশ তুমি দিলে ভালো হয়। এটা তো আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।”
ঐশির মনে হলো, তার স্বপ্নের আকাশে হঠাৎ কালো মেঘ জমেছে।
হ্যারি তো এতদিন টাকা পাঠিয়েছে। আইফোন দিয়েছে। শপিংয়ের জন্য টাকা দিয়েছে।
তাহলে এখন কেন সে সাহায্য চাইছে?
সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—বিয়ে তো দু’জনের ব্যাপার। খরচ ভাগাভাগি হতেই পারে।
কিন্তু তার মনের ভেতরে সন্দেহের সূক্ষ্ম কাঁটা বিঁধে রইল।
কয়েকদিন পর হ্যারি আবার বলল,
“একটা জরুরি সমস্যা হয়েছে। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ব্লক। তুমি যদি কিছু টাকা পাঠাতে পারো…”
ঐশির চোখে যেন সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।
সে ভাবছিল—বিদেশে থাকা একজন মানুষ, এত সম্পদ যার, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হঠাৎ ব্লক? আর সেই মানুষই তার কাছ থেকে টাকা চাইছে?
তার আনন্দে ভরা মনটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
রাত আড়াইটা।
ঘড়ির কাঁটা যেন তার হৃদয়ের স্পন্দনের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে।
ঐশি বিছানায় বসে ফোনের স্ক্রিনে হ্যারির মেসেজগুলো পড়ছিল।
“ট্রাস্ট মি।”
“ইটস ফর আওয়ার ম্যারেজ।”
“ডোন্ট ইউ লাভ মি?”
ভালোবাসা—শব্দটা আবারও তাকে চাপে ফেলল।
সে কি ভালোবাসে?
ভালোবাসলে কি প্রমাণ দিতে হয় টাকায়?
তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল অতীতের সেই রাত। নিজের সীমা অতিক্রম করা মুহূর্ত।
যদি হ্যারি সেই ভিডিওগুলো রেখে থাকে?
যদি সবকিছু কেবল একটা ফাঁদ হয়?
তার শরীর ঠান্ডা হয়ে এল।
এত আনন্দের মাঝেও যে বড় ধরনের খারাপ খবর লুকিয়ে ছিল—সে এখন তা অনুভব করতে পারছে।
হয়তো এই বিয়ের প্রস্তাবই ছিল সেই খবরের শুরু।
ঐশি জানালার বাইরে তাকাল। শহর ঘুমিয়ে আছে।
কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই।
সে ভাবল—বিদেশ মানেই কি সুখ?
টাকা মানেই কি নিরাপত্তা?
আর ভালোবাসা মানেই কি প্রমাণের বিনিময়?
তার ভেতরের খুশি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
স্বপ্নের জার্মানি এখন কেমন যেন দূরের মরীচিকা।
সে বুঝতে পারছে না—হ্যারি সত্যিই তাকে বিয়ে করতে চায়, নাকি এই সম্পর্কের ভেতরে আরেকটি উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে।
রাত আড়াইটা আবারও সাক্ষী হলো—একটি মেয়ের স্বপ্নভঙ্গের শুরুতে।
ঐশির চোখ দিয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ল।
সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কি ভুল করছি?”
উত্তর নেই।
শুধু অন্ধকার।
হয়তো আগামী রাত আরও কঠিন হবে।
হয়তো সত্য আরও নির্মম।
রাত আড়াইটা এখনও থেমে আছে—
ঐশির জীবনের সেই মুহূর্তে, যেখানে আনন্দ আর আশঙ্কা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢেকে আছে।
চলবে...........