পর্ব–২
দুঃখ পুরোটা বিষ হয়ে ওঠে না,
আমি পুরোটা ভেঙে পড়ি না।
তুমি যেন জীবনের সেই গোপন কারণ,
যার ব্যাখ্যা ভাষায় দেওয়া যায় না—
এই কথাগুলো কুদ্দুছ আজকাল নিজের অজান্তেই ভাবে। আগে দুঃখ এলে তা শরীরের ভেতর বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ত। বুকের ভেতর জ্বালা করত, মাথা ভারী হয়ে যেত, পৃথিবীটাকে অসহনীয় লাগত। এখনো দুঃখ আসে, আগের মতোই হঠাৎ করে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই। কিন্তু আশ্চর্য, তা আর আমাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করতে পারে না। কোথাও যেন এক টুকরো আলো রয়ে যায়—যা নিভে যেতে দেয় না আমাকে।
ঐশি, তোমাকে এই কথাগুলো কখনো বলা হয়নি। বলা যায়ও না। কারণ কিছু অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করলে তার গভীরতা কমে যায়। তুমি যেন জীবনের সেই গোপন কারণ, যার ব্যাখ্যা ভাষায় দেওয়া যায় না। তুমি কোনো প্রতিশ্রুতি নও, কোনো সম্পর্কের সামাজিক নামও নও—তবু তুমি আছো। আর সেই ‘আছো’ শব্দটাই আমার দিনগুলোকে বদলে দেয়।
গত কয়েক সপ্তাহ খুব সহজ ছিল না। ব্যবসার হিসাব মিলছিল না। ধারদেনার চাপ বেড়েছে। যাদের আপন ভেবেছিলাম, তারা অনেকেই দূরে সরে গেছে। ফোন করলে ব্যস্ততার অজুহাত, সামনে পড়লে কৃত্রিম হাসি। মানুষ আসলে প্রয়োজনে যতটা কাছে আসে, অপ্রয়োজনে ততটাই দূরে সরে যায়—এই সত্য নতুন নয়, তবু প্রতিবারই কষ্ট দেয়।
একদিন সন্ধ্যায় বাজার থেকে ফিরছিলাম। আকাশে মেঘ ছিল ভারী, বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। পকেটে টাকা কম, মাথায় অগণিত চিন্তা। মনে হচ্ছিল, আর পারছি না। বাড়ির ভাঙা দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। তোমার কল।
“কেমন আছো?”—স্বাভাবিক প্রশ্ন।
আমি বললাম, “ভালো।”
তুমি নিশ্চুপ হলে কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বললে, “ভালো না থাকলেও বলতে পারো।”
সেই মুহূর্তে বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো হু হু করে বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু আমি নিজেকে সামলে নিলাম। পুরুষ মানুষ নাকি সহজে দুর্বল হয় না—এই ভ্রান্ত অহংকার এখনো আমাকে আটকে রাখে। তবু সেদিন স্বীকার করেছিলাম, “কিছুটা কঠিন যাচ্ছে।”
তুমি কোনো বড় উপদেশ দাওনি। শুধু বলেছিলে, “কঠিন সময় স্থায়ী হয় না। মানুষ থাকে।”
এই ‘মানুষ থাকে’ কথাটা আমার মাথায় ঘুরতে থাকে। সত্যিই কি থাকে? অনেকেই তো থাকে না। তবু তুমি আছো। দূরে থেকেও আছো। ব্যস্ততার ভেতর থেকেও সময় করে আছো। এই উপস্থিতি কোনো উচ্চারণের দাবি করে না, কোনো প্রতিদানেরও নয়। তবু তার প্রভাব গভীর।
দুঃখ পুরোটা বিষ হয়ে ওঠে না—হয়তো কারণ তুমি আছো বলে। আমি পুরোটা ভেঙে পড়ি না—হয়তো কারণ কোথাও জানি, আমার লড়াইটা কেউ নীরবে দেখছে, বুঝছে।
কখনো কখনো ভাবি, আমাদের সম্পর্কের নাম কী? বন্ধুত্ব? সহানুভূতি? না কি তারও গভীরে কিছু? কিন্তু তারপরই থেমে যাই। সবকিছুর নাম দিতে হয় না। কিছু সম্পর্ক নামহীন থাকলেই বেশি পবিত্র থাকে।
সেদিন রাতে প্রবল বৃষ্টি হলো। টিনের চালায় টুপটাপ শব্দ পড়ছিল। আমি বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, জীবনের এই অনিশ্চয়তা কতদিন চলবে? ঠিক তখনই তোমার একটা বার্তা—
“বৃষ্টি হলে আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয় সব মুছে যায়।”
আমি লিখলাম, “সব কি সত্যিই মুছে যায়?”
তুমি উত্তর দিলে, “না, সব না। তবে সহ্য করা সহজ হয়।”
সহ্য করা—এই শব্দটার ভেতরেই হয়তো আমাদের জীবনের সত্য লুকিয়ে আছে। সবকিছু বদলানো যায় না, সব সমস্যার সমাধান হয় না। কিন্তু সহ্য করার শক্তি যদি থাকে, তবে মানুষ টিকে যায়।
তুমি আমার জীবনে সেই শক্তিটুকু এনে দিয়েছো। কোনো নাটকীয়তা ছাড়া, কোনো দাবি ছাড়া। শুধু উপস্থিত থেকে।
আমি এখন ছোট ছোট স্বপ্ন দেখতে শিখছি। আগে স্বপ্ন মানেই বড় কিছু—টাকা, প্রতিষ্ঠা, সম্মান। এখন স্বপ্ন মানে—ঋণমুক্ত একটা সকাল, মায়ের চিকিৎসার নিশ্চিন্ত ব্যবস্থা, ভাঙা উঠোনে নতুন ইট বসানো। আর তার সঙ্গে একটা শান্ত সম্পর্ক, যেখানে কেউ কাউকে বদলাতে চায় না—শুধু বুঝতে চায়।
ঐশি, তুমি হয়তো জানো না, তোমার কথাগুলো আমাকে কতবার ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে ফিরিয়ে এনেছে। রাগের মাথায় অনেকবার সব ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করেছে। শহরে গিয়ে নতুন করে শুরু করার কথা ভেবেছি। কিন্তু তারপর মনে হয়েছে, পালিয়ে গেলে কি সত্যিই মুক্তি মিলবে? তুমি বলেছিলে, “নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে লড়াই করাটাই সাহস।”
আমি সেই সাহসটা খুঁজে পেতে শুরু করেছি।
একদিন তুমি বললে, “তুমি বদলে গেছো।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “খারাপভাবে?”
তুমি হেসে বললে, “না, গভীরভাবে।”
এই ‘গভীরভাবে’ শব্দটা আমাকে নতুন করে ভাবায়। হয়তো সত্যিই আমি আগের মতো নেই। কষ্ট আমাকে কঠিন করেছে, আর তুমি আমাকে নরম রেখেছো। এই দুইয়ের ভারসাম্যেই হয়তো মানুষ পূর্ণ হয়।
রাত যত গভীর হয়, ততই বুঝি—তুমি আমার জীবনের সেই গোপন কারণ, যার ব্যাখ্যা ভাষায় দেওয়া যায় না। তুমি না থাকলে হয়তো আমি টিকে থাকতামই, কিন্তু ভেতরটা শুকিয়ে যেত। এখনো শুকিয়ে যায়নি। কোথাও একফোঁটা জল আছে।
আমি জানি না ভবিষ্যৎ কী লিখে রেখেছে। হয়তো আমাদের পথ এক হবে, হয়তো হবে না। কিন্তু এই সময়টুকু, এই অনুভূতিগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে সত্য অংশ হয়ে থাকবে।
দুঃখ আসবে, ব্যর্থতা আসবে, মানুষ বদলাবে। তবু যদি তুমি পাশে থাকো—এই দূরত্ব নিয়েই—তবে আমি আর পুরোটা ভেঙে পড়ব না। কারণ আমি জেনে গেছি, মানুষ একা থাকলেও সম্পূর্ণ একা নয়, যদি তার হৃদয়ে কারও জন্য নীরব আলো জ্বলে।
সেই আলোটাই তুমি, ঐশি।
চলবে...........