ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:০৪:১৩ PM

উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা

মান্নান মারুফ, বিশেষ প্রতিনিধি
26-02-2026 01:35:08 PM
উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা
 

শেষ পর্ব

রিয়া এখন বুঝতে পারে—
সবাই উপদেশ দেওয়ার যোগ্য না,
আর সব “সাপোর্ট” সত্যিকারের সাপোর্ট না।

জীবন তাকে খুব কঠিনভাবে এই শিক্ষাটা দিয়েছে। একসময় সে ভাবত, যে তার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, সে-ই তার আপন। যে তার কষ্ট শুনছে, সে-ই তার মঙ্গল চায়। কিন্তু এখন বুঝেছে—সব শোনার মানুষ বোঝার মানুষ নয়, আর সব বোঝানোর মানুষ পথ দেখাতে জানে না।

কিছু মানুষ জীবনে আসে সাহায্য করতে না,
ভুল পথে ঠেলে দিতে।

তারা ইচ্ছা করে দেয় কি না—তা হয়তো সবসময় বোঝা যায় না। কিন্তু ভুল উপদেশ, ভুল সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত—এই দুটো মিলেই মানুষের জীবনকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।

দুইটা সংসার হারিয়ে
রিয়া একটা জিনিস শিখেছে—
সিদ্ধান্ত যখন হৃদয়ের কষ্টে নেওয়া হয়,
তখন তার মূল্য দিতে হয় পুরো জীবন দিয়ে।

আজ সে একা একটি ছোট্ট ভাড়া বাসায় বসে আছে। পেটে তার সন্তান, আর সামনে দীর্ঘ অজানা পথ। গার্মেন্টসের চাকরিটা এখনও করছে, যদিও শরীর দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছেন, কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার বিলাসিতা তার নেই।

রাতে ঘুম ভাঙলে সে চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে পড়ে—প্রথম সংসারের সেই বারান্দা, সন্তানের হাসি, কুদ্দুছের নীরব উপস্থিতি। কত সহজ ছিল সেই জীবন! হয়তো নিখুঁত ছিল না, কিন্তু নিরাপদ ছিল।

নিরাপত্তার মূল্য মানুষ সাধারণত তখনই বোঝে, যখন তা হারিয়ে যায়।

দ্বিতীয় সংসারের কথা মনে পড়লে তার বুক কেঁপে ওঠে। চার মাসের ভালোবাসা, তারপর ভয়, অপমান, আঘাত। সে ভাবত ভালোবাসা মানেই উষ্ণতা, মানেই আদর। আজ বুঝেছে—ভালোবাসা মানে শ্রদ্ধা। যেখানে শ্রদ্ধা নেই, সেখানে সম্পর্ক কেবল একটি ফাঁদ।

রিয়া এখন প্রায়ই নামাজ পড়ে। অনেকদিন পরে সে সেজদায় মাথা রাখে। চোখের জল মাটিতে পড়ে। সে ফিসফিস করে বলে—
“আল্লাহ, আমি ভুল করেছি। আমাকে মাফ করে দিন।”

আজ রিয়া শুধু দোয়া করে—
আল্লাহ যেন তাকে ক্ষমা করেন,
তার সন্তানকে ভালো রাখেন,
আর এই ভাঙা জীবনটাকে আবার নতুন করে দাঁড়ানোর শক্তি দেন।

দোয়া করার সময় তার কণ্ঠ কাঁপে। কারণ সে জানে—কিছু ভুলের শাস্তি মুছে যায় না, শুধু সহ্য করতে হয়।

তার চারপাশে এখন আর কেউ নেই।
না বান্ধবী, না প্রেমিক, না পরিবার।

পরিবারের নম্বর অনেকবার হাতে নিয়েছে। ফোন করতে চেয়েছে। কিন্তু কী বলবে? “আমি ভুল করেছি?” এই স্বীকারোক্তির ভার এখনও তার কণ্ঠে আটকে থাকে। তবু সে জানে, একদিন তাকে বলতে হবে। কারণ মানুষ যতই ভেঙে পড়ুক, শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনও মরে না।

গার্মেন্টসে কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে তীব্র ব্যথা ওঠে পেটে। সে চুপ করে বসে থাকে। সহকর্মীরা জিজ্ঞেস করলে হাসে—“কিছু না।”
কিন্তু সে জানে, তার শরীর আর আগের মতো নেই।

একটি ভুলের মাসুল দিতে গিয়ে আর একটি ভুল—
আর সেই ভুল তার জীবনকে অভিশপ্ত করেছে।

দ্বিতীয় বিয়েটাই ছিল সেই ভুল। প্রথম ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে নেওয়া দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত। ভাঙা মন নিয়ে, অপূর্ণ বোঝাপড়া নিয়ে নতুন সংসার শুরু করা—এটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় অন্ধকার অধ্যায়।

এই ভুল আর কোনোদিন পুরোপুরি সমাধান হবে না—রিয়া জানে।
কারণ সময় ফিরে আসে না।
কিছু সম্পর্ক ভাঙলে তা আর আগের মতো জোড়া লাগে না।
কিছু আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা আর পুরোপুরি ফিরে আসে না।

তবু…

তবু মানুষের ভেতরে একটা অদ্ভুত শক্তি থাকে—বাঁচার।
রিয়া সেই শক্তিটুকু আঁকড়ে ধরতে চাইছে।

এক সন্ধ্যায় গার্মেন্টস থেকে ফেরার পথে সে হঠাৎ প্রথম স্বামীর বাড়ির রাস্তার দিকে পা বাড়াল। দূর থেকে দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে আলো জ্বলছে। হয়তো তার সন্তান পড়ছে, হয়তো কুদ্দুছ ক্লান্ত শরীরে বসে আছে।

তার বুকের ভেতর হাহাকার উঠল, কিন্তু সে দরজায় কড়া নাড়ল না।
কেবল মনে মনে বলল—“তোমরা ভালো থেকো।”

সে জানে, অতীতকে আর ছুঁতে পারবে না।
কিন্তু অন্তত সে চাইতে পারে, তারা যেন শান্তিতে থাকে।

রাতে ঘরে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দীর্ঘক্ষণ দেখল। এই মুখে ক্লান্তি আছে, অনুতাপ আছে, কিন্তু একটুকরো দৃঢ়তাও আছে। সে বুঝেছে—নিজের ভুল স্বীকার করাই প্রথম মুক্তি।

পেটের ভেতর সন্তান নড়াচড়া করল।
রিয়া হালকা হেসে বলল—“তুমি আমার নতুন শুরু।”

হয়তো তার জীবন নিখুঁত হবে না। হয়তো সে আর কখনও সেই হারানো সংসার ফিরে পাবে না। কিন্তু সে তার সন্তানের জন্য একটি সৎ, স্থির জীবন গড়ার চেষ্টা করবে। এবার সে কারও অন্ধ উপদেশে নয়, নিজের বিবেকের আলোয় সিদ্ধান্ত নেবে।

অচেনা ঠিকানার পথ অনেক দীর্ঘ ছিল।
সে পথ তাকে ভেঙেছে, শিখিয়েছে, শাস্তি দিয়েছে।

আজ রিয়া দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ধিক্ষণে।
পেছনে দুইটা ভাঙা সংসার,
সামনে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

কিন্তু তার বুকের ভেতর এখন একটাই প্রার্থনা—
“হে আল্লাহ, আমাকে শক্তি দিন। আমার ভুলের জন্য আমার সন্তানকে কষ্ট পেতে দেবেন না।”

চোখ বেয়ে অশ্রু নামে, কিন্তু সেই অশ্রু আগের মতো শুধুই দুর্বলতার নয়। সেখানে আছে অনুতাপের সঙ্গে দায়িত্ববোধও।

অচেনা ঠিকানার এই গল্প শেষ হয় না সুখের উল্লাসে, না সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
এটি শেষ হয় এক উপলব্ধিতে—

মানুষ ভুল করে,
ভুলের শাস্তি পায়,
তবু যদি সে নিজের ভুলকে স্বীকার করে নতুন করে দাঁড়াতে চায়—
তবে সেখানেই তার সত্যিকারের যাত্রা শুরু।

রিয়ার জীবন হয়তো আগের মতো হবে না।
কিন্তু সে এবার জানে—
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হৃদয়ের কষ্টকে নয়, বিবেকের আলোকে অনুসরণ করতে হয়।

অচেনা ঠিকানার দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়।
ভেতরে এক ভাঙা নারী নয়—
এক অনুতপ্ত, কিন্তু দৃঢ় মা নতুন ভোরের অপেক্ষায় বসে থাকে।

শেষ ।।