ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:০৩:০১ PM

উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা

মান্নান মারুফ, বিশেষ প্রতিনিধি
26-02-2026 01:25:48 PM
উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা

পর্ব–৮

প্রেমিক স্বামীর সঙ্গে কী হচ্ছে—আবার সেই বান্ধবীর কাছেই সব খুলে বলল রিয়া।
কাঁপা গলায়, থেমে থেমে, অপমান আর আঘাতের গল্প বলল।
ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো।
তারপর সেই একই সহজ সমাধান—
“ডিভোর্স দিয়ে দাও।”

শব্দটা যেন রিয়ার কানে ধাতব আওয়াজ তুলল।
ডিভোর্স।
আবার?

রিয়া আবার ভেঙে যাওয়া একটা সংসার শেষ করে দিল।
দ্বিতীয়বার।

দুইটা সংসার,
দুইটা সিদ্ধান্ত,
আর মাঝখানে রিয়া—
একটা ক্লান্ত, ভাঙা মানুষ।

দ্বিতীয় বিচ্ছেদটা ছিল আরও নীরব, আরও একাকী। এবার কোনো প্রশ্নও ছিল না, কোনো অনুরোধও না। যে মানুষটি তাকে একসময় “তুমি শুধু আমার” বলেছিল, সে-ই ঠাণ্ডা গলায় বলল, “যাও, যেখানে খুশি যাও। আমার দায়িত্ব শেষ।”

রিয়া বুঝল—সে আসলে কখনোই দায়িত্ব ছিল না, ছিল কেবল এক অধিকারবোধের বস্তু।

বাড়ি ছাড়ার দিন তার হাতে ছিল একটি ছোট ব্যাগ। কিছু কাপড়, কিছু কাগজপত্র, আর অদৃশ্য এক পাহাড়সম অনুশোচনা। পেটে এক মাসের সন্তান এখন ধীরে ধীরে দুই মাসের দিকে এগোচ্ছে। শরীর ভারী লাগছে, মাথা ঘোরে, কিন্তু থামার উপায় নেই।

পরিবারের কাছে ফিরবে?
সাহস নেই।
আগের স্বামীর কাছে যাবে?
অধিকার নেই।
বান্ধবী?
সে তো আছে—এমনটাই ভাবত।

কিন্তু পৃথিবী খুব দ্রুত বদলে যায়।

একটি গার্মেন্টসে চাকরি পেল রিয়া। পরিচিত এক মহিলার মাধ্যমে। সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা—দশ ঘণ্টার ডিউটি। মাঝে অল্প বিরতি। শব্দে ভরা বিশাল হলরুম, সারি সারি সেলাই মেশিন, ঘাম আর ক্লান্তির গন্ধে ভারী বাতাস।

প্রথম দিন মেশিনের সামনে বসতেই তার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। সুইয়ের শব্দ যেন কানে ছুরি চালায়। পাশের মেয়েটি বলল, “আপা, নতুন নাকি? ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাবে।”

অভ্যাস?
ব্যথারও কি অভ্যাস হয়?

শরীর তখন থেকেই ভেঙে পড়তে শুরু করল। পেটে সন্তান, তবু তাকে বসে থাকতে হয় টানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাঝে মাঝে তলপেটে টান লাগে। সে চমকে ওঠে। হাত রেখে ফিসফিস করে বলে, “মা, একটু সহ্য করো। আমাদের বাঁচতে হবে।”

মনে ভয়—সব একসাথে তাকে চেপে ধরল।

রাতে ছোট্ট ভাড়া করা ঘরে ফিরে সে ক্লান্ত শরীরটা মাটির বিছানায় ফেলে দেয়। ফ্যানের শব্দে ঘর কাঁপে, তবু গরম কমে না। জানালার বাইরে অন্ধকার। মাঝে মাঝে মনে হয়—এই অন্ধকারই তার প্রকৃত ঠিকানা।

একদিন সাহস করে সে বান্ধবীকে ফোন দিল।
যে বান্ধবী একসময় বলত, “আমি আছি।”
কল বেজে যায়, কেউ ধরে না।
আবার দেয়।
আবারও না।

পরদিন মেসেজ পাঠায়—“আমি খুব বিপদে আছি।”
সিন হয়, উত্তর আসে না।

রিয়ার বুকের ভেতর যেন কিছু ভেঙে পড়ে।
এতদিন যার কথায় জীবন বদলেছে, সে-ই আজ নিঃশব্দ। হয়তো তার জীবনে নতুন ব্যস্ততা এসেছে, নতুন গল্প। সেখানে রিয়ার ভাঙা অধ্যায়ের জায়গা নেই।

দুপুরে গার্মেন্টসের ক্যান্টিনে বসে শুকনো ভাত খেতে খেতে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেল রিয়া। সহকর্মীরা পানি দিল, কেউ বলল ডাক্তার দেখাতে। সে মৃদু হেসে বলল, “কিছু না, ঠিক আছি।”

কিন্তু সে জানে—কিছুই ঠিক নেই।

ডাক্তারের কাছে গেলে জানা গেল শরীর খুব দুর্বল। বিশ্রাম দরকার, পুষ্টিকর খাবার দরকার। রিয়া চুপ করে মাথা নোয়াল। বিশ্রাম? পুষ্টি? সে তো টাকার অঙ্ক কষে কষে দিন পার করছে। ঘরভাড়া, খাবার, ওষুধ—সব মিলিয়ে মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না।

রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখে সে চমকে ওঠে। চোখের নিচে কালি, ঠোঁট শুকনো, চুল এলোমেলো। এই কি সেই রিয়া, যে একসময় নিজের সুখের খোঁজে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?

এখন সে শুধু বাঁচতে চায়। নিজের জন্য নয়, পেটের সন্তানের জন্য।

কখনো কখনো আগের জীবনের স্মৃতি তাকে তাড়া করে। প্রথম স্বামীর শান্ত মুখ, সন্তানের হাসি, সংসারের ছোটখাটো অভিমান—সব মিলিয়ে এক টুকরো স্থিরতা ছিল। সে ভেবেছিল তা ছিল শূন্যতা। আজ বুঝতে পারে—শূন্যতা আর নিরাপত্তাহীনতা এক নয়।

দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে কাটানো চার মাস যেন এক দুঃস্বপ্ন। আঘাতের চিহ্ন শরীর থেকে মুছে গেছে, কিন্তু মনে দাগ রয়ে গেছে।

এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙল। টিনের চালে টুপটাপ শব্দ। রিয়া উঠে বসে। পেটে হালকা নড়াচড়া টের পায়। তার চোখে পানি এসে যায়। সে জানে না ভবিষ্যৎ কী, কিন্তু এই শিশুটি তার রক্তমাংস।

সে ফিসফিস করে বলে, “তুমি আমার ভুলের শাস্তি নও। তুমি আমার নতুন শুরু।”

কিন্তু নতুন শুরুর পথ কাঁটায় ভরা।

গার্মেন্টসের সুপারভাইজার একদিন কড়া গলায় বলল, “এভাবে বারবার অসুস্থ হলে কাজ থাকবে না।”
রিয়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কাজ হারালে সে কোথায় যাবে?

বাড়ি ফিরে আবার ফোন দেয় বান্ধবীকে। এবারও না।
শেষমেশ সে বুঝল—সবাই ‘আছি’ বলে, কিন্তু বিপদে কেউ থাকে না।

তার পরিবার? বহুদিন যোগাযোগ নেই। অহংকারের দেয়াল এত উঁচু করে তুলেছিল যে এখন নিজেই তা টপকাতে ভয় লাগে। তবু মাঝে মাঝে মায়ের কণ্ঠস্বর মনে পড়ে—“সংসার ভাঙা সহজ, গড়া কঠিন।”

রিয়া জানালার পাশে বসে থাকে। বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে হালকা চাঁদ উঠেছে। মনে হয়, চাঁদও হয়তো কত ভাঙা রাত পার করে পূর্ণ হয়।

দুইটা সংসার, দুইটা সিদ্ধান্ত—সবকিছুর দায় এখন তার কাঁধে। কাউকে দোষ দিয়ে আর মুক্তি নেই।

অচেনা ঠিকানায় দাঁড়িয়ে সে আজ বুঝতে পারছে—সুখ খোঁজার আগে নিজেকে বোঝা জরুরি ছিল। এখন সে ক্লান্ত, তবু সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। কারণ তার ভেতরে আরেকটি প্রাণ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠছে।

হয়তো এই সন্তানই তাকে আবার দাঁড়াতে শেখাবে।

ফোনটা পাশে পড়ে আছে—নীরব, নিস্তব্ধ।
রিয়ার জীবনের মতোই।

তবু ভোর হবে।
গার্মেন্টসের সাইরেন বাজবে।
সে আবার মেশিনের সামনে বসবে।

কিন্তু তার বুকের ভেতর একটুকরো দৃঢ়তা জন্ম নিচ্ছে—
এবার সে সিদ্ধান্ত নেবে নিজের বুদ্ধিতে, অন্য কারও কথায় নয়।

অচেনা ঠিকানার পথ দীর্ঘ, অন্ধকার।
তবু হাঁটা থামানো যাবে না।

চলবে................