ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০২:৪৮:৫৩ PM

উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা

মান্নান মারুফ, বিশেষ প্রতিনিধি
26-02-2026 12:40:19 PM
উপন্যাস: অচেনা ঠিকানা

পর্ব–৬

রিয়া বান্ধবীর কথা বিশ্বাস করে ফেলল—
সে মনে করলো এটা তার ভুল না। ভুল করছে না।
রিয়া শুধু নিজের সুখ খুঁজছে।

একসময় যে অপরাধবোধ তাকে গভীর রাতে নিঃশব্দে কাঁদাত, সেই অপরাধবোধ এখন যুক্তির মোড়কে ঢেকে গেছে। নাজমার কথাগুলো তার মাথায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকত—“নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজের। সুখ যদি না পাও, তবে খুঁজে নাও।” সেই কথাগুলো ধীরে ধীরে তার বিবেকের কণ্ঠস্বরকে ম্লান করে দিল।

সে ভাবতে শিখল—ভালোবাসা যদি শুকিয়ে যায়, তবে সম্পর্কের বৃক্ষও তো আর সবুজ থাকে না। কুদ্দুছ ব্যস্ত ছিল, সবসময় ব্যস্ত। অফিস, ব্যবসা, দায়িত্ব—এই তিন শব্দ যেন তার জীবনের কেন্দ্র। রিয়ার নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস সে কি কোনোদিন শুনেছিল? হয়তো শুনেছিল, কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি। অন্তত রিয়ার মনে এমনটাই জন্ম নিয়েছিল।

বয়ফ্রেন্ডের পরামর্শে রিয়া তার স্বামীকে ডিভোর্স দেয়।

দিনটি ছিল মেঘলা। আকাশে রোদ ছিল না, আবার বৃষ্টিও না—একটা অদ্ভুত ধূসর আলো চারদিকে ছড়িয়ে ছিল। ঠিক তেমনি ধূসর হয়ে গিয়েছিল রিয়ার মন। কোর্টের সাদা দেয়াল, কাঠের টেবিল, ফাইলের শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে যেন জীবনের একটা অধ্যায়কে শুষে নিচ্ছিল।

কুদ্দুছ চুপচাপ বসেছিল। চোখে ক্লান্তি, মুখে কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একবার জিজ্ঞেস করেছিল, “এটাই কি তোমার শেষ সিদ্ধান্ত?”

রিয়া চোখ তুলে তাকাতে পারেনি। ঠোঁট কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু সে বলেছিল, “হ্যাঁ।”

যে মানুষটা রিয়াকে কখনো মারেনি, কখনো প্রতারণা করেনি, শুধু ব্যস্ত ছিল—
রিয়া তাকেই ছেড়ে দিল।

সেই মুহূর্তে কুদ্দুছের চোখে যে ব্যথার রেখা ফুটে উঠেছিল, তা রিয়ার বুকের গভীরে কোথাও আঁচড় কেটেছিল। কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করে রাখল। মনে মনে বলল—“এটা আমার অধিকার। আমি সুখী হওয়ার জন্যই তো এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”

ডিভোর্সের কাগজে সই করার পর এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। বাইরে বেরিয়ে আসতেই নতুন মানুষটি তার পাশে দাঁড়াল। আশ্বাসের সুরে বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন আমরা মুক্ত।”

মুক্ত? শব্দটা কানে বাজল। কিন্তু এই মুক্তির ভেতর কেন যেন অদৃশ্য শিকল লেগে আছে।

রিয়ার পরিবার তার সিদ্ধান্তে একদম রাজি ছিল না। মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “সংসারে অভিমান থাকে, কিন্তু তাই বলে ভেঙে ফেলতে হয়?” বাবা নীরব থেকেও চোখের ভাষায় অনুরোধ করেছিলেন—“আরেকবার ভেবে দেখ।”

কিন্তু তখন রিয়ার মনে হয়েছিল, সবাই তার বিরুদ্ধে। কেউ তার অনুভূতির মূল্য দিচ্ছে না। রাগে-অভিমানে সে তাদের সাথেও যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল।

ফোন নম্বর বদলে ফেলল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্লক করল, এমনকি আত্মীয়দের সঙ্গেও দূরত্ব রাখল। সে যেন নিজের চারপাশে এক নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে চাইল—যেখানে অতীতের কোনো ছায়া থাকবে না।

শুরুতে সবকিছু রঙিন লাগত। নতুন মানুষের সঙ্গে নতুন পরিকল্পনা, নতুন স্বপ্ন। শহরের কোলাহলের ভেতর হাত ধরে হাঁটা, ক্যাফেতে বসে ভবিষ্যতের কথা বলা—সবকিছু যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো। রিয়া নিজেকে বোঝাল, “আমি ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি।”

কিন্তু সময় বড় নির্মম।

দিন যেতে না যেতেই ছোট ছোট ফাঁক চোখে পড়তে লাগল। যে মানুষটি একসময় তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা শুনত, এখন সে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে নিজের কাজে। ফোন ধরতে দেরি হচ্ছে, মেসেজের উত্তর আসছে সংক্ষিপ্ত হয়ে। রিয়া অবাক হয়ে দেখে—ব্যস্ততা শুধু কুদ্দুছেরই ছিল না, এই মানুষটির জীবনেও দায়িত্ব আছে, অগ্রাধিকার আছে।

এক সন্ধ্যায় রিয়া একা বসে ছিল নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দায়। সূর্য ডুবে যাচ্ছে, আকাশে লালচে আলো। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল পুরোনো বাসার বারান্দা। কুদ্দুছ চা হাতে এসে দাঁড়াত, চুপচাপ পাশে বসে থাকত। খুব বেশি কথা হতো না, কিন্তু সেই নীরবতায় একধরনের স্থিরতা ছিল।

সে বুঝতে পারল—শুধু উত্তেজনা দিয়ে সংসার হয় না, স্থিরতাও দরকার।

তার সন্তানের কথা মনে পড়ল। আদালতের সিদ্ধান্তে সন্তান বাবার কাছেই আছে। রিয়া তখন ভেবেছিল—কিছুদিন পর সব ঠিক হলে সে সন্তানের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু রাত গভীর হলে বুকের ভেতর হাহাকার জেগে ওঠে—“মা” বলে ডাকার সেই কণ্ঠ এখন আর তার ঘরে শোনা যায় না।

একদিন সাহস করে সে সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে গেল। কুদ্দুছ দরজা খুলল। চোখে বিস্ময়, কিন্তু অভদ্রতা নেই। সন্তান দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। ছোট্ট কণ্ঠে প্রশ্ন—“মা, তুমি আর এখানে থাকো না কেন?”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল। সে উত্তর খুঁজে পেল না। শুধু সন্তানের চুলে হাত বুলিয়ে দিল।

সেদিন বাড়ি ফিরে সে দীর্ঘক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। এই কি সেই সুখ, যার জন্য এত কিছু ভাঙল? নিজের পরিবার, নিজের সন্তান, নিজের অতীত—সবকিছুকে দূরে ঠেলে দিয়ে যে সুখের খোঁজে বেরিয়েছিল, তা কি সত্যিই ধরা দিয়েছে?

নতুন মানুষটি এখন মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়। বলে, “তুমি এত অতীতে থাকো কেন? আমরা তো সামনে এগোচ্ছি।”
রিয়া চুপ করে থাকে। কারণ সে জানে, অতীত মুছে ফেলা যায় না। তা ছায়ার মতো পিছু নেয়।

নাজমা একদিন ফোন করল। বলল, “কেমন আছো?”

রিয়া হালকা হেসে বলল, “ভালো।”
কিন্তু সেই ‘ভালো’র ভেতর যে কতটা শূন্যতা, তা কেউ শুনতে পেল না।

রাতে বিছানায় শুয়ে সে ভাবতে লাগল—ভুল কি সত্যিই ভুল ছিল না? নাকি সে নিজের অস্থিরতাকে ‘সুখের অধিকার’ বলে নাম দিয়েছিল?

কুদ্দুছ হয়তো তাকে সময় দিতে পারেনি, কিন্তু সে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আর আজ রিয়া নিজেই নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার মতো এক যন্ত্রণায় ডুবে আছে।

জীবন তাকে নতুন ঠিকানা দিয়েছে, কিন্তু সেই ঠিকানা অচেনা। সেখানে হাসি আছে, কিন্তু গভীরতা নেই; আলো আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই।

বারান্দার ওপরে চাঁদ উঠেছে। রিয়া তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, চাঁদও তো একা—অসংখ্য মানুষের আকাশে জ্বললেও তার নিজের কোনো ঘর নেই।

রিয়া কি তবে সেই চাঁদের মতো হয়ে গেল?

অচেনা ঠিকানার পথে হাঁটতে হাঁটতে সে বুঝতে শুরু করেছে—সুখ শুধু সিদ্ধান্তের ফল নয়; সুখ হলো দায়িত্ব, ত্যাগ, ধৈর্য আর ভালোবাসার সমন্বয়। কোনো এক মুহূর্তের অভিমান দিয়ে তাকে মাপা যায় না।

কিন্তু সময় তো আর পেছনে ফেরে না।

রিয়ার চোখ বেয়ে নেমে আসে নিঃশব্দ অশ্রু। এই অশ্রুতে আছে অনুতাপ, আছে শূন্যতা, আছে হারিয়ে ফেলা এক স্থির জীবনের স্মৃতি।

অচেনা ঠিকানায় দাঁড়িয়ে সে প্রথমবার অনুভব করল—নিজের সুখ খুঁজতে গিয়ে সে হয়তো নিজের আশ্রয়টাই হারিয়ে ফেলেছে।

 চলবে............