পর্ব–৪
কুদ্দুছ কখনো রিয়ার সাথে প্রতারণা করেনি। কখনো গায়ে হাত তোলে নি। সংসারের গল্পে এই দুইটি বাক্য যেন প্রমাণের মতো দাঁড়িয়ে থাকে—দেখো, সব ঠিক আছে। মানুষটি খারাপ নয়। সে দায়িত্বশীল, উপার্জন করে, সংসার চালায়। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বলবে না, এই ঘরে কোনো ভাঙন আছে।
তবুও একাকীত্ব মানুষকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। রিয়াও ঠিক একইভাবে দুর্বল হতে থাকল। কিন্তু তখনও রিয়া কুদ্দুছের সত্যটা দেখতে পায়নি—সে বুঝতে পারেনি, অবহেলা কখনো কখনো শারীরিক আঘাতের থেকেও গভীর ক্ষত তৈরি করে।
দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল একই ছন্দে। কুদ্দুছ অফিস, ফোন, ক্লান্তি। রিয়া পড়াশোনা, রান্না, অপেক্ষা। কথোপকথন কমে এসে দাঁড়িয়েছে প্রয়োজনীয় শব্দে—“খাবার দাও”, “বিলটা দিও”, “কাল একটু দেরি হবে।”
এই সময়েই রিয়ার জীবনে আসে একজন।
তার নাম রুদ্র।
অবিবাহিত, বয়সে রিয়ার চেয়ে দু-তিন বছর ছোট। দেখতে স্মার্ট, পরিপাটি, কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাসী। অনলাইন কোর্সের একটি গ্রুপে প্রথম পরিচয়। একটি অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন করেছিল রিয়া। রুদ্র খুব ধৈর্য নিয়ে উত্তর দিয়েছিল।
প্রথমে কথাগুলো ছিল একেবারে পড়াশোনা নিয়ে।
—“এই রেফারেন্সটা দেখেছেন?”
—“আপনার পয়েন্টটা ভালো ছিল।”
ধীরে ধীরে আলোচনা বাড়তে লাগল। পড়ার ফাঁকে হালকা গল্প। রুদ্র বলত,
—“আপনি খুব সুন্দর করে লিখতে পারেন।”
অনেকদিন পর কেউ রিয়ার লেখার প্রশংসা করল। তার ভেতরে যেন জমে থাকা আত্মবিশ্বাস একটু মাথা তুলল।
রিয়া প্রথমে সচেতন ছিল। সে জানত, সীমা কোথায়। সে বিবাহিত। তার সংসার আছে। কিন্তু মন কি সবসময় নিয়ম মেনে চলে?
এক সন্ধ্যায় কুদ্দুছ আবার দেরি করবে বলে জানাল। রিয়া একা বসে ছিল। ফোনে রুদ্রের মেসেজ এল—
“আজ মন খারাপ?”
রিয়া একটু থমকে গেল। সে কি এতটাই বোঝা যায়?
—“হ্যাঁ, একটু।”
—“বলবেন?”
এই ‘বলবেন?’ শব্দটার ভেতরে ছিল মন খোলার আমন্ত্রণ। অনেকদিন কেউ তাকে এমন করে জিজ্ঞেস করেনি—কী হয়েছে?
রিয়া লিখতে শুরু করল। কুদ্দুছের ব্যস্ততা, নিজের একাকীত্ব, না বলা কষ্ট—সবকিছু। রুদ্র মন দিয়ে শুনল। মাঝেমধ্যে লিখল,
“আপনি এত শক্ত হয়ে আছেন কীভাবে?”
“আপনার জায়গায় হলে আমি ভেঙে পড়তাম।”
এই সহানুভূতি রিয়ার ভেতরের দুর্বল জায়গাগুলোকে নরম করে দিল। সে বুঝতে পারল না—এই নরম হওয়াটাই বিপদ।
দিনের পর দিন কথা চলতে লাগল। ফোনে, চ্যাটে, মাঝেমধ্যে ভিডিও কলেও। রুদ্রের হাসি প্রাণবন্ত, কথায় উষ্ণতা। সে নিজের স্বপ্নের কথা বলে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলে। রিয়ার মনে হয়, সে আবার তরুণী হয়ে উঠছে—যে স্বপ্ন দেখে, যে নিজের কথা বলতে চায়।
কুদ্দুছ কিছু টের পায়নি প্রথমে। সে নিজেও তো দূরে সরে গিয়েছিল। ঘরে থেকেও অনুপস্থিত ছিল।
রিয়া মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করত—আমি কী করছি? এটা কি ভুল?
কিন্তু তারপরই আরেকটা যুক্তি মাথা তুলত—আমি তো কাউকে ঠকাচ্ছি না। আমি শুধু কথা বলছি। আমারও তো কথা বলার অধিকার আছে।
একদিন রুদ্র বলল,
—“আপনার সাথে কথা না বললে দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।”
এই বাক্যটা রিয়ার বুকের ভেতর ঢেউ তুলল। অনেকদিন কেউ তাকে এভাবে প্রয়োজনের কথা বলেনি।
ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভেতরে অন্য রং ঢুকতে শুরু করল। রুদ্র তার ছবি পাঠায়, রিয়া নিজের নতুন শাড়ির ছবি শেয়ার করে। কথার ভেতরে ইঙ্গিত বাড়ে। আবেগের সুর গভীর হয়।
একদিন রুদ্র বলল,
—“আপনি সুখী নন।”
রিয়া লিখল,
—“সব সংসারেই কিছু না কিছু অপূর্ণতা থাকে।”
—“অপূর্ণতা মেনে নেওয়া আর কষ্ট নিয়ে বাঁচা এক জিনিস না।”
কথাগুলো তার মাথায় ঘুরতে লাগল।
রিয়া ভাবলো আমি নিজেও বুঝতে পারিনি—কখন যে ভুল পথে জড়িয়ে গেলাম।
একদিন তারা দেখা করল। একটি ক্যাফেতে। খুব সাধারণ দেখা—কফি, হালকা কথা। কিন্তু চোখের ভেতর যে আকর্ষণ, তা আর সাধারণ ছিল না। রিয়া বারবার মনে মনে বলছিল—এটা শেষ দেখা। আমি ফিরে যাব।
কিন্তু মানুষ নিজের দুর্বলতার কাছে কখনও কখনও পরাজিত হয়।
এভাবে একটা বছর কেটে গেল।
বছরটা বাইরে থেকে স্বাভাবিক। কুদ্দুছ অফিসে যায়, রিয়া সংসার সামলায়। মাঝেমধ্যে ঝগড়া, মাঝে মাঝে নীরবতা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে রিয়ার জীবনে আরেকটি গোপন অধ্যায় তৈরি হলো।
তৈরি হলো একটা গভীর সম্পর্ক।
রুদ্র এখন তার অভ্যাস। দিনের শুরুতে মেসেজ, রাতে শুভরাত্রি। মন খারাপ হলে প্রথমে যার কথা মনে পড়ে—সে রুদ্র। কুদ্দুছ পাশে ঘুমিয়ে থাকলেও, রিয়ার মন অন্য কোথাও উড়ে যায়।
তবুও কুদ্দুছ কখনো খারাপ আচরণ করেনি। কখনো সন্দেহ প্রকাশ করেনি। তার ব্যস্ততা আছে, ক্লান্তি আছে—কিন্তু বিশ্বাসটুকু অটুট।
এই বিশ্বাসই একদিন রিয়ার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধল।
এক রাতে কুদ্দুছ হঠাৎ বলল,
—“তুমি কি আমার সাথে খুশি?”
প্রশ্নটা অপ্রস্তুত করে দিল রিয়াকে।
—“কেন এমন বলছ?”
—“মনে হয় তুমি অনেক দূরে চলে গেছ।”
রিয়া উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে জানে—কিছুটা দূরে সে নিজেই চলে গেছে।
রুদ্রের সাথে সম্পর্কটা এখন শুধু কথায় সীমাবদ্ধ নেই। আবেগের গভীরতা তাকে টেনে নিচ্ছে। কিন্তু সেই গভীরতার নিচে অপরাধবোধের ছায়াও ঘন হচ্ছে।
রিয়া মাঝে মাঝে আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকায়। সে কি সেই একই মানুষ, যে একসময় শুধু সংসার বাঁচাতে চেয়েছিল?
একাকীত্ব তাকে দুর্বল করেছিল। সহানুভূতি তাকে টেনেছিল। কিন্তু এই পথের শেষ কোথায়?
রুদ্র একদিন বলল,
—“তুমি চাইলে আমরা নতুন করে শুরু করতে পারি।”
নতুন করে?
তাহলে পুরোনোটা ভেঙে ফেলতে হবে।
রিয়া জানে—ভালবাসা শুধু আকর্ষণ নয়, দায়ও আছে। কুদ্দুছ তাকে কখনো আঘাত করেনি। অবহেলা করেছে, হয়তো দূরে সরে গেছে—কিন্তু বিশ্বাস ভাঙেনি।
এখন সে দাঁড়িয়ে আছে দুই সত্যের মাঝখানে—
একদিকে নিঃশব্দ কিন্তু বৈধ সম্পর্ক,
অন্যদিকে উষ্ণ কিন্তু অনিশ্চিত আকর্ষণ।
রাত গভীর। কুদ্দুছ ঘুমিয়ে। রিয়ার ফোনে রুদ্রের মেসেজ—
“আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
রিয়া চোখ বন্ধ করে। তার মনে হয়—সে কি নিজেকেই হারাচ্ছে?
চলবে...............