পর্ব–১
২০১৮ সালে রিয়ার বিয়ে হয়েছিল।
পারিবারিকভাবেই বিয়ে।
অচেনা মানুষ, অচেনা সংসার—
তবুও প্রথম প্রথম সবকিছু মন্দ ছিল না তার।
শীতের শেষ বিকেলের মতো ছিল সেই সময়টা—নরম, হালকা কুয়াশায় মোড়া, অনিশ্চিত অথচ আশাব্যঞ্জক। রিয়া যখন লাল বেনারসি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল, তখন তার চোখে ছিল একসাথে ভয় আর স্বপ্নের আলো। সে জানত না সামনে কেমন মানুষ, কেমন জীবন অপেক্ষা করছে। শুধু জানত—বাবা-মায়ের মুখের হাসিটুকু রক্ষা করাই তার প্রথম দায়িত্ব।
রিয়ার বিয়ে হয়েছিল কুদ্দুছের সাথে। শহরতলির মধ্যবিত্ত এক পরিবার। কুদ্দুছ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত, শান্ত স্বভাবের ছেলে বলেই পাড়ায় তার সুনাম ছিল। বিয়ের দিন সবাই বলেছিল, “মেয়েটার কপাল ভাল, ছেলেটা ভদ্র।” রিয়া চুপচাপ শুনেছিল। কপাল ভাল কিনা, তা সময়ই বলে—এই কথাটা সে মায়ের কাছ থেকেই শিখেছে।
বিয়ের পরের দিনগুলো ছিল নতুন বইয়ের পাতার মতো—সতেজ, অদেখা, কিছুটা কৌতূহল জাগানো। শ্বশুরবাড়ির ঘরগুলো যেন তাকে মাপছিল। কোন তাকের উপর কী রাখা, কার সামনে কতটুকু কথা বলা, কখন হাসা—সবই শেখার বিষয়। রিয়া চেষ্টা করত ভুল না করতে। সে ছোটবেলা থেকেই এমন—নিজেকে গুছিয়ে রাখতে ভালবাসে, অন্যের কষ্ট না দিতে চায়।
কুদ্দুছ প্রথমদিকে সত্যিই খেয়াল রাখত তাকে। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করত,
—“তোমার কিছু লাগবে?”
রিয়া মাথা নেড়ে বলত,
—“না, সব আছে।”
রাতের খাবারের পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু’জনে আকাশ দেখত। দূরে রেললাইনের শব্দ ভেসে আসত, আরিফ তখন নিজের অফিসের গল্প বলত—সহকর্মীদের হাসি-ঠাট্টা, বসের রাগ, নতুন প্রজেক্টের চাপ। রিয়া মন দিয়ে শুনত। মাঝে মাঝে নিজের কথাও বলত—তার কলেজ জীবনের বন্ধুদের কথা, অপূর্ণ থেকে যাওয়া মাস্টার্সের স্বপ্ন, ছোটবেলার কবিতা লেখার শখ।
কুদ্দুছ শুনত। অন্তত তখন শুনত।
রিয়া ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছিল তার নতুন জীবনের সাথে। শাশুড়ি মাঝেমধ্যে শিখিয়ে দিতেন রান্নার নতুন রেসিপি। শ্বশুর খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বলতেন, “মা, চা দেবে?”—এই ‘মা’ সম্বোধনটা শুনে রিয়ার মনটা নরম হয়ে যেত। মনে হতো, সে এই বাড়িরই একজন।
তবুও, সবকিছুর আড়ালে একটা চাপা অচেনা অনুভূতি লুকিয়ে থাকত। যেন খুব সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। হাসিটাও মেপে, কথাটাও মেপে। নিজের মতামত প্রকাশ করার আগে দু’বার ভাবতে হতো। কিন্তু সে নিজেকে বোঝাত—নতুন সংসার, সময় লাগবেই।
একদিন সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। ঘর অন্ধকার। মোমবাতির আলোয় কুদ্দুছ বলেছিল,
—“রিয়া, তুমি চাইলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারো। আমি আপত্তি করব না।”
রিয়ার চোখ জ্বলে উঠেছিল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ, তবে সংসারের কাজ সামলে নিতে পারলে।”
সেই ‘তবে’ শব্দটা তখন তার কানে খুব একটা লাগেনি। সে ভেবেছিল, এ তো স্বাভাবিক শর্ত। সংসার তো দু’জনেরই। সে পারবে।
দিন যেতে লাগল। ধীরে ধীরে রিয়া বুঝতে শুরু করল—যতটা সহজ ভেবেছিল, ততটা নয়। আরিফের যত্নশীল আচরণের ফাঁকে ফাঁকে কিছু অদ্ভুত নীরবতা জন্ম নিতে লাগল। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে ফোনে বিরক্তি ঝরে পড়ত তার গলায়।
—“কাকে এত ফোন করছিলে?”
—“মায়ের সাথে কথা বলছিলাম।”
—“প্রতিদিন এত কথা বলার কী আছে?”
রিয়া প্রথমে অবাক হয়েছিল। তারপর নিজেকে বোঝাল—হয়তো কাজের চাপ। নতুন সংসারে ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে।
শাশুড়িও মাঝেমধ্যে খোঁচা দিয়ে বলতেন, “বিয়ের পর মেয়েদের বাপের বাড়ির কথা একটু কম ভাবাই ভাল।” কথাগুলো সরাসরি কঠিন না হলেও, ভিতরে ভিতরে একটা দেয়াল তুলে দিত।
তবুও রিয়া হার মানেনি। সে ভোরে উঠে রান্না করত, ঘর গোছাত, দুপুরে একা একা খেত, বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখত। মাঝে মাঝে ডায়েরিতে লিখত—
“আমি ঠিক আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
একদিন সে কলেজের এক বান্ধবীর সাথে দেখা করতে চাইল। কুদ্দুছ প্রথমে কিছু বলেনি। কিন্তু যাওয়ার সময় বলল,
—“খুব বেশি স্বাধীনতা কিন্তু ভাল না।”
রিয়া থমকে গিয়েছিল।
—“আমি কি কিছু ভুল করছি?”
—“না, তবে মেয়েদের চলাফেরা একটু হিসেব করে হওয়া উচিত।”
কথাগুলো তেমন তীক্ষ্ণ ছিল না, কিন্তু ভেতরে কেমন যেন খচখচ করছিল। এই মানুষটাই তো বলেছিল পড়াশোনা চালিয়ে যেতে। এই মানুষটাই প্রথম দিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে স্বপ্নের কথা শুনত।
রিয়া বুঝতে পারছিল—কিছু একটা বদলাচ্ছে। কিন্তু কী?
এক রাতে ঝগড়া হলো খুব সামান্য কারণে। লবণে একটু কম হয়েছিল ডালে। কুদ্দুছ চুপচাপ খাওয়া ছেড়ে উঠে গেল। পরে বলল,
—“তুমি মন দিয়ে কাজ করো না।”
রিয়ার চোখে জল চলে এসেছিল। সে সারাদিন কত কাজ করে, কেউ কি দেখে? সে কি ইচ্ছা করে ভুল করে?
তবুও পরদিন সকালে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। নাস্তার প্লেটে অমলেট সাজিয়ে দিল। কুদ্দুছ খেতে খেতে কিছু বলল না। শুধু ফোনে তাকিয়ে রইল। এই নীরবতাই যেন বেশি কষ্ট দিচ্ছিল।
রিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। তার চোখের নিচে হালকা কালি। ঠোঁটের হাসিটা কেমন যেন কৃত্রিম। সে ভাবল—এটাই কি বিবাহিত জীবনের স্বাভাবিক রূপ? নাকি কোথাও কিছু ভুল হচ্ছে?
বিকেলে শ্বশুরবাড়ির ছাদে উঠে সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। দূরে ডুবে যাওয়া সূর্যকে দেখে মনে হচ্ছিল, তার নিজের ভেতরেও কিছু একটা ডুবে যাচ্ছে। সে কি নিজের স্বপ্নগুলো খুব সহজে ছেড়ে দিচ্ছে? নাকি এটাই মানিয়ে নেওয়া?
হঠাৎ তার ফোনে মায়ের কল।
—“কেমন আছিস মা?”
রিয়া একটু থেমে বলল,
—“ভাল আছি।”
মা বুঝতে পারলেন না, এই ‘ভাল’ শব্দটার ভেতরে কতটা চাপা কান্না। রিয়াও বলতে পারল না। সে চায়নি বাবা-মা চিন্তা করুক। সে তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—সে সুখে থাকবে।
রাতে কুদ্দুছ বলল,
—“তুমি খুব সংবেদনশীল হয়ে যাচ্ছ। সংসারে একটু শক্ত হতে হয়।”
রিয়া চুপ করে শুনল। হয়তো সত্যিই তাকে শক্ত হতে হবে। কিন্তু শক্ত হওয়া মানে কি নিজের অনুভূতি গিলে ফেলা?
সেদিন ডায়েরিতে সে লিখল—
“আমি বদলে যাচ্ছি। নাকি আমাকে বদলে দেওয়া হচ্ছে?”
ঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। যত্নের জায়গায় নিয়ন্ত্রণ, কথোপকথনের জায়গায় নীরবতা, স্বপ্নের জায়গায় শর্ত—সবকিছু অদৃশ্যভাবে জায়গা বদল করছিল। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক। পাড়া-প্রতিবেশীরা বলত, “দেখে তো বেশ সুখী মনে হয়।”
কিন্তু সুখ কি শুধু বাইরে থেকে দেখা যায়?
রিয়া এখনো আশা ছাড়েনি। সে বিশ্বাস করতে চায়—ভালবাসা একদিন আবার ফিরে আসবে, আগের মতো। হয়তো এই সময়টা কেটে যাবে। হয়তো দু’জনেরই ভুল বোঝাবুঝি।
তবুও তার ভেতরের কোথাও একটা প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে—
এই সংসারে সে কি সত্যিই নিজের মতো থাকতে পারবে?
নাকি একসময় তাকে পুরোপুরি বদলে যেতে হবে?
২০১৮ সালের সেই শীতের বিকেল থেকে শুরু হওয়া নতুন জীবনের গল্প তখনো শেষ হয়নি। বরং শুরুই হয়েছে মাত্র। অচেনা মানুষটিকে চিনতে, অচেনা সংসারটিকে বুঝতে, আর সবচেয়ে বেশি—নিজেকে হারিয়ে না ফেলতে—রিয়ার লড়াই কেবল শুরু।
চলবে...........