ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬,
সময়: ০৯:০৮:১১ PM

উপন্যাস, ”বেয়াদব”

মান্নান মারুফ
15-05-2026 08:21:13 PM
উপন্যাস, ”বেয়াদব”

চতুর্থ পর্ব

সেদিন শহরে অদ্ভুত এক বিষণ্ন বিকেল নেমেছিল। আকাশে রোদ ছিল, কিন্তু সেই রোদে উষ্ণতা ছিল না। যেন আলোও ক্লান্ত হয়ে গেছে মানুষের ভেতরের অন্ধকার দেখে। কুদ্দুস ধীরে ধীরে হাঁটছিল পুরোনো মসজিদের দিকে। তার পায়ের শব্দে ক্লান্তি ছিল, চোখে ছিল জমে থাকা অপমানের ধোঁয়া। কয়েকদিন ধরে সে অদ্ভুত এক নীরবতার ভেতর ডুবে আছে। ক্লাবের সদস্যপদ নিয়ে আবারও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যারা গতকালও তার ভাল ব্যাবহার করতো, তারাই আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

অপমান মানুষকে সবসময় কাঁদায় না। কখনও কখনও মানুষ এতটাই নিঃশব্দ হয়ে যায় যে, ভেতরের শব্দও বাইরে আসে না।

কুদ্দুস সেই নিঃশব্দ অবস্থাতেই ছিল।

পুরোনো মসজিদটার বারান্দায় বসে ছিলেন মাওলানা হাফেজ করিম। সাদা পাঞ্জাবি, ধবধবে দাড়ি, চোখে গভীর শান্তির আলো। তাকে দেখলে মনে হতো, পৃথিবীর কোলাহল তার ভেতর পৌঁছাতে পারে না।

শহরের মানুষ তাকে শুধু আলেম হিসেবে নয়, বিবেকবান মানুষ হিসেবেও সম্মান করত। তিনি ধর্মকে ভয় দেখানোর অস্ত্র বানাননি; মানুষের ভাঙা আত্মাকে জোড়া লাগানোর ভাষা বানিয়েছেন।

কুদ্দুস বারান্দায় উঠে সালাম দিল।

—আসসালামু আলাইকুম, হুজুর।

মাওলানা মুখ তুলে তাকালেন। মৃদু হাসলেন।

—ওয়ালাইকুম সালাম। কুদ্দুস, তোমারে খুব ক্লান্ত লাগতেছে।

কুদ্দুস একটু থামল। তারপর ধীরে বসে পড়ল তার সামনে।

মসজিদের ভেতর তখন মাগরিবের আগে নীরবতা। দূরে কয়েকটা শিশু কোরআন পড়ছে। বাতাসে পুরোনো মাদুরের গন্ধ।

কুদ্দুস অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

মাওলানা তাকিয়ে ছিলেন। তিনি জানতেন, কিছু মানুষের কষ্ট জোর করে জানতে চাওয়া যায় না। অপেক্ষা করতে হয়, যতক্ষণ না ব্যথা নিজে মুখ খোলে।

অবশেষে কুদ্দুস নিচু গলায় বলল,

—হুজুর… মানুষরে ইচ্ছা কইরা হক” থেইকা বঞ্চিত করা কি পাপ?

মাওলানার চোখ স্থির হয়ে গেল।

তিনি প্রশ্নটা শুনেই বুঝলেন, এই কথার পেছনে শুধু সদস্যপদ নেই; আছে অপমান, আছে ভাঙা বিশ্বাস, আছে মানুষের মুখোশ দেখে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া এক আত্মা।

মাওলানা ধীরে বললেন,

—কেন এই প্রশ্ন করতেছ কুদ্দুস?

কুদ্দুস তিক্ত হেসে মাথা নিচু করল।

—হুজুর, এই শহরে মনে হয় যোগ্যতা ও সততা পাপ। যারা তেল দেয়, যারা মাথা নোয়ায়, যারা মিথ্যা প্রশংসা করে—তাদের জন্য দরজা খোলা থাকে। আর যারা সত্য কথা কয়, তাদের জন্য অপমান খাড়া।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর সে আবার বলল,

—আমি তো কারও ক্ষতি করি নাই হুজুর। মানুষের উপকার করার চেষ্টা করছি। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করছি। তাইলে আমারে এভাবে ছোট করা হয় ক্যান?

মাওলানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

—দুনিয়াতে সবচেয়ে কঠিন কাজ হইলো সত্য কথা বলা। আর সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ হইলো সেই মানুষ, যে নিজের স্বার্থের জন্য অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে না।

কুদ্দুস চুপ করে শুনছিল।

মাওলানা এবার একটু সামনে ঝুঁকলেন।

—শুনো কুদ্দুস, কাউরে ইচ্ছা কইরা ছোট করা, তার প্রাপ্য মাইরা খাওয়া—এইটা শুধু সামাজিক অন্যায় না; এইটা আল্লাহর কাছেও বড় জুলুম।

তার কণ্ঠ আরও গভীর হয়ে উঠল।

—মানুষের হক মাইরা খাইলে বিচার শুধু আখেরাতে না, দুনিয়াতেও শুরু হয়।

কুদ্দুস ধীরে মুখ তুলল।

মাওলানা বললেন,

—তুমি কি মনে করো, অন্যায় কইরা মানুষ শান্তিতে থাকে? না। বাইরে হাসলেও ভিতরে আগুন জ্বলে। কারণ বিবেকরে কেউ পুরোপুরি মাইরা ফেলতে পারে না।

মসজিদের মিনার থেকে তখন আজানের ধ্বনি ভেসে উঠল। সেই ধ্বনি যেন সন্ধ্যার আকাশ ভেদ করে শহরের ওপর নেমে আসছিল।

কুদ্দুসের বুকের ভেতর জমে থাকা ভার কিছুটা নরম হলো।

সে ধীরে বলল,

—কিন্তু হুজুর, যারা অন্যায় করে তারা তো আরও ক্ষমতাবান হইতেছে।

মাওলানা হালকা হাসলেন।

—ক্ষমতা আর শান্তি এক জিনিস না কুদ্দুস।

তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—অনেক মানুষ আছে, বাইরে রাজা… ভিতরে কয়েদি।

কুদ্দুসের মনে পড়ল রশীদ সাহেবের কথা। বড় গাড়ি, ক্ষমতা, চারপাশে মানুষ—সব আছে। কিন্তু তার চোখে সবসময় অদ্ভুত এক ভয় লুকিয়ে থাকে।

মাওলানা যেন তার মনের কথাই বলে ফেললেন।

—যে মানুষ অন্যের হক নষ্ট করে নিজের চেয়ার বাঁচায়, সে ভিতরে ভিতরে সবসময় ভয় পায়। কারণ সে জানে, তার ভিত্তি সত্যের ওপর না।

হঠাৎ বাতাসে মসজিদের মাঠের শুকনো পাতা উড়ে গেল।

মাওলানা নিচু স্বরে বললেন,

—ক্লাবটা মরেনি কুদ্দুস… মরছে মানুষের বিবেক।

এই কথাটা শুনে কুদ্দুস দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল।

তার মনে হলো, এই একটা বাক্য যেন পুরো শহরের ছবি।

ভবন আছে, চেয়ার আছে, সভা আছে, নির্বাচন আছে—শুধু বিবেক নেই।

কুদ্দুস ধীরে বলল,

—হুজুর, কখনও কখনও খুব রাগ হয়। মনে হয়, সবাইরে সত্যটা চিৎকার কইরা কই।

মাওলানা মৃদু হেসে বললেন,

—সত্য সবসময় চিৎকার কইরা বলতে হয় না। সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হইলো—সময়।

তিনি একটু থামলেন।

—তুমি প্রতিশোধ নিও না। আল্লাহর বিচার অপেক্ষা করতে শেখো। কারণ মানুষের আদালতে অনেক সময় বিচার হয় টাকার, দলের, ক্ষমতার। কিন্তু আল্লাহর আদালতে বিচার হয় নিয়তের।

কুদ্দুসের চোখ ভিজে উঠছিল।

সে এতদিন অপমানের বিরুদ্ধে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আজ অনেকদিন পর মনে হলো, কেউ অন্তত তার কষ্টটা বুঝেছে।

মাওলানা ধীরে তার কাঁধে হাত রাখলেন।

—শুনো, তুমি যদি সত্যের পথে থাকো, তাইলে তোমারে একা মনে হইলেও তুমি একা না।

কুদ্দুস নিচু গলায় বলল,

—কখনও কখনও খুব একা লাগে হুজুর।

—নবীরাও একা আছিলেন কুদ্দুস। সত্যের পথ কখনও ভিড়ের পথ না।

মসজিদের ভেতর তখন নামাজের কাতার দাঁড়াতে শুরু করেছে। কয়েকজন বৃদ্ধ, কয়েকজন তরুণ, কয়েকজন শ্রমিক—সবাই একই কাতারে।

কুদ্দুস তাকিয়ে রইল।

এই দৃশ্যটা তার ভালো লাগল। এখানে অন্তত পদমর্যাদা নেই। এখানে সভাপতি আর সাধারণ মানুষের পার্থক্য নেই।

মাওলানা ধীরে বললেন,

—মানুষ যত বড় চেয়ারেই বসুক, শেষ পর্যন্ত সবাই একই মাটির নিচে যায়। কিন্তু সমস্যা হইলো, ক্ষমতা মানুষরে এই কথাটা ভুলাইয়া দেয়।

কুদ্দুস নিঃশ্বাস ফেলল।

—তাইলে কি বিচার হইব হুজুর?

মাওলানার চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা ফুটে উঠল।

—বিচার অবশ্যই হইব। আল্লাহ কাউরে ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না।

বাইরে তখন সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে গেছে। শহরের আলো জ্বলছে, গাড়ির শব্দ বাড়ছে। কিন্তু মসজিদের ভেতরে অদ্ভুত শান্তি।

কুদ্দুস উঠে দাঁড়াল।

তার মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতরের ভার কিছুটা হালকা হয়েছে।

বিদায় নেওয়ার আগে মাওলানা আবার বললেন,

—মনে রাখবা কুদ্দুস, মানুষ তোমারে বেয়াদব বলতে পারে। কিন্তু সত্যের কাছে মাথা নত না করা কখনও বেয়াদবি না।

কুদ্দুস মাথা নিচু করল।

তারপর ধীরে ধীরে মসজিদের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।

শহরটা আগের মতোই আছে।
একই ভণ্ডামি, একই ক্ষমতার খেলা, একই মুখোশ।

কিন্তু কুদ্দুসের ভেতরটা কিছু বদলে গেছে।

আজ সে বুঝেছে—
মানুষের দরজায় অপমান থাকলেও, সৃষ্টিকর্তার আদালতে এখনও ন্যায় বিচার বেঁচে আছে।

 
চলবে.........