তৃতীয় পর্ব
ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির পুরোনো দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে মানুষের চরিত্রের মতো হয়ে উঠছিল—বাইরে রঙিন, ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া দেহ। একসময় এখানে প্রবেশের শর্ত ছিল পেশাদার ও যোগ্যতা; এখন প্রয়োজন কেবল “লাইন”। কার সঙ্গে ওঠাবসা, কার পেছনে দাঁড়িয়ে হাততালি দেওয়া যায়—সেটাই হয়ে উঠেছে পরিচয়ের বা সদস্য পাওয়ার প্রধান মানদণ্ড।
প্রবেশদ্বারের দেয়ালে এখনো বড় অক্ষরে লেখা—
“পেশাদারদের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার।”
কুদ্দুস প্রায়ই সেই লেখাটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। কারণ ভেতরের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে এখন পেশাদারের চেয়ে চাটুকারের মূল্য বেশি।
দাওয়াত না দিলে সদস্যপদ না দেওয়ার হুমকি, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরও গোপনে নতুন নাম যুক্ত করা, আর অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের সদস্য বানানো—এসব যেন ক্লাবের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। ক্লাবের কুতুবেরা বাইরে নিরীহ, অথচ ভেতরে ভয়ংকর প্রভাবশালী। অনেকে তাদের প্রকাশ্যে কিছু না বললেও আড়ালে “চামচা” কিংবা “দালাল” বলেই চিনে।
এই অবক্ষয়ের অন্যতম কারিগর ছিল জসিম উদ্দিন —যাকে সবাই চিনত “জি হুজুর জসিম” নামে। ক্ষমতাবানদের খুশি রাখাই ছিল তার একমাত্র যোগ্যতা। সভাপতি রশীদ সাহেব কাশি দিলেও সে প্রশংসা করত। তার টাকা কামনো ছাড়া নিজের আর কোনো আদর্শ ছিল না, কিন্তু মানুষের দুর্বলতা বোঝার অদ্ভুত দক্ষতা ছিল।
সে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করত কুদ্দুসকে।
কারণ কুদ্দুস ছিল এমন একজন মানুষ, যাকে ব্যবহার করা যায় না।
নির্বাচন উপলক্ষে সেদিন ক্লাবে বড় সভা বসেছিল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে রশীদ সাহেব বলছিলেন,
—এই ক্লাব সবসময় যোগ্য মানুষদের মূল্যায়ন করেছে।
সামনের সারি হাততালিতে ভরে উঠল। সবচেয়ে জোরে তালি দিচ্ছিল জসিম। কুদ্দুস পেছনে বসে বুঝতে পারছিল—এই হাততালির অধিকাংশই সম্মানের নয়, ভয়ের।
চা-বিরতির সময় জসিম ফিসফিস করে বলছিল,
—কুদ্দুস থাকলে সমস্যা হবেই।
একজন বলল,
—কিন্তু সে তো মিথ্যা বলে না।
জসিম ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর দিল,
—সব সত্য সব জায়গায় বলতে নাই।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে কুদ্দুস শহরের আলো দেখছিল। তখন এক তরুণ সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি এত প্রতিবাদ করেন কেন?
কুদ্দুস শান্ত স্বরে বলল,
—সব কাজ লাভের জন্য করা হয় না; কিছু কাজ মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার জন্য করতে হয়।
সভা আবার শুরু হলো। সদস্যপদ ও কমিটি নিয়ে আলোচনা চলছিল। এক প্রবীণ সদস্য অভিযোগ তুললেন—ক্লাবে পেশার বাইরের মানুষ বাড়ছে।
জসিম হেসে বলল,
—সময় বদলেছে। এখন সবাইকে নিয়েই চলতে হয়।
কুদ্দুস ধীরে দাঁড়িয়ে বলল,
—সবাইকে নেওয়ার নামে যদি পেশাটাকেই বিক্রি করে দেন, তাহলে এই ক্লাব আর পেশাজীবীদের থাকে না।
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
রশীদ সাহেব কড়া স্বরে বললেন,
—আপনি কি বলতে চান আমরা ক্লাব নষ্ট করছি?
কুদ্দুস শান্তভাবে উত্তর দিল,
—আমি কিছু বলতে চাই না। ক্লাবের বর্তমান অবস্থাই সব বলে দিচ্ছে।
জসিম উত্তেজিত হয়ে উঠল।
—এইভাবে সিনিয়রদের অসম্মান করা ঠিক না!
কুদ্দুস তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—অসম্মান আর সত্য এক জিনিস নয়, জসিম। তুমি পার্থক্যটা ভুলে গেছ।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কারণ সত্য উচ্চারিত হলে পুরো পরিবেশ অস্বস্তিতে ভরে যায়।
কুদ্দুস আবার বলল,
—এখানে এখন ভোটের চেয়ে চামচামির মূল্য বেশি। যোগ্যতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারা গণতন্ত্র না, দরবার চালাচ্ছেন।
কেউ প্রতিবাদ করল না। কারণ সবাই জানত, কথাগুলো মিথ্যা নয়।
সভা দ্রুত শেষ হয়ে গেল। অনেকেই চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে গেল, যেন সত্য শুনে ফেলাটাও অপরাধ।
বাইরে এসে জসিম সিগারেট ধরিয়ে নিচু গলায় বলল,
—স্যার, লোকটারে থামানো দরকার।
রশীদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—যে মানুষ ভয় পায় না, তাকে থামানো কঠিন।
অন্যদিকে কুদ্দুস একা হাঁটছিল শহরের রাস্তায়। তার পাশে কোনো ক্ষমতা নেই, কোনো পদ নেই, কোনো বাহিনীও নেই। তবু তাকে পরাজিত মনে হচ্ছিল না।
কারণ কিছু মানুষ পদ হারায়, আর কিছু মানুষ হারায় আত্মা।
কুদ্দুস অন্তত নিজের আত্মাকে বিক্রি করেনি।
রাতের বাতাসে শহরের শব্দ ভেসে আসছিল। আর কুদ্দুসের মনে বারবার ফিরে আসছিল একটাই উপলব্ধি—
যে সমাজে চাটুকাররা ভদ্রলোক হয়ে ওঠে, সেখানে সত্যবাদী মানুষদের “বেয়াদব” বলাই স্বাভাবিক।
চলবে…