বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে ঘিরে যে শঙ্কার কথা উঠে এসেছে, তা শুধু একটি বাণিজ্যিক উদ্বেগ নয়—এটি আগামী দশকের অর্থনৈতিক বাস্তবতার পূর্বাভাস। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করেছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন বাংলাদেশ ২০২৯ সালে এলডিসি উত্তরণের পর জিএসপি সুবিধা হারাতে যাচ্ছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই যায় ইইউতে। এতদিন বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণে মূল্য প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ছিল। কিন্তু ভারত-ইইউ এফটিএ কার্যকর হলে সেই সুবিধা আর একচেটিয়া থাকবে না। ভারতও একই বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি কার্যত দুর্বল হয়ে পড়বে।
ভারতের জন্য বিষয়টি কেবল শুল্ক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির নিজস্ব বিশাল তুলা উৎপাদন, শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, উন্নত বন্দর অবকাঠামো এবং সরকারি প্রণোদনা ব্যবস্থা তাদের আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। অর্থাৎ ভারত শুধু কম শুল্ক নয়, দ্রুত সরবরাহ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং বড় আকারের শিল্প বিনিয়োগের সুবিধাও একসাথে পাচ্ছে। এই সমন্বিত সক্ষমতা ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ভারতকে এগিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ইতোমধ্যেই “অর্ডার ডাইভার্সিফিকেশন” শুরু করেছে বলে শিল্পমালিকরা দাবি করছেন। বড় ব্র্যান্ডগুলো ভবিষ্যতের শুল্ক কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে ধীরে ধীরে ভারতের দিকে ঝুঁকছে। এটি তাৎক্ষণিক ধস নয়, বরং ধীরগতির বাজার সরে যাওয়ার ইঙ্গিত। বড় ক্রেতারা সাধারণত ৩-৫ বছরের সরবরাহ পরিকল্পনা করে। তাই তারা আগেভাগেই বিকল্প প্রস্তুত করছে।
তবে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও শক্তিশালী। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ভারতের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। বাংলাদেশের বড় শক্তি হলো—
- বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা
- আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সে অভিজ্ঞতা
- বড় ভলিউমের অর্ডার দ্রুত সামলানোর দক্ষতা
- দক্ষ শ্রমনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা
ভারত এখনও বাংলাদেশের মতো একই পরিসরের বৃহৎ কারখানা অবকাঠামো পুরোপুরি তৈরি করতে পারেনি। ফলে রাতারাতি বাজার দখল সম্ভব নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে—এটাই মূল বার্তা।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি জরুরি করণীয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত এফটিএ বা সমমানের বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু করতে হবে। এমনকি আলোচনা শুরু হওয়ার বার্তাটিও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। বিশেষ করে—
- জ্বালানি ও গ্যাস সংকট
- বন্দরের ধীরগতি
- ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা
- কাস্টমস জটিলতা
- উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়
- আইনশৃঙ্খলা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা
তৃতীয়ত, স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদন ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের ওভেন সেক্টর এখনও ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। এতে উৎপাদন সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে।
চতুর্থত, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ এখনও মূলত বেসিক পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বিশ্ববাজারে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার, টেকসই ফ্যাশন ও উচ্চমূল্যের পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
সবশেষে, এই সংকটকে কেবল হুমকি হিসেবে না দেখে শিল্প পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবেও দেখা দরকার। কারণ জিএসপি সুবিধার ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এখন প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে দক্ষতা, অবকাঠামো, কূটনীতি এবং নীতিগত সক্ষমতা—সবকিছু একসাথে শক্তিশালী করতে হবে।
বাংলাদেশ এখনও ইউরোপীয় বাজারে শক্ত অবস্থানে আছে। কিন্তু ২০২৯–পরবর্তী বাস্তবতায় সেই অবস্থান ধরে রাখতে হলে এখন থেকেই কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।