দ্বিতীয় পর্ব
বাগানবাড়ির প্রতিটি ফুল যেন কুদ্দুসের হৃদয়ের একেকটি স্বপ্ন ছিল। ভোরের শিশির মাখা গোলাপ, রঙিন ডালিয়া, সাদা বেলি আর লাল জবা—সবকিছুতেই সে অনামিকার হাসি খুঁজে পেত। প্রতিদিন সকাল শুরু হতো ফুলগাছের যত্ন নেওয়ার মধ্য দিয়ে। হাতে পানি ভরা ঝাঁঝরি নিয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে ঘুরে বেড়াত কুদ্দুস। তার মনে হতো, এই ফুলগুলো যেমন যত্নে বেঁচে থাকে, তেমনি ভালোবাসাও যত্নেই টিকে থাকে।
অনামিকা প্রায়ই বাগানবাড়িতে আসত। কখনও বিকেলে, কখনও সন্ধ্যার আগে। বাড়ির বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে দু’জন নানা গল্প করত। কুদ্দুস কথা বলত স্বপ্ন নিয়ে—একটি ছোট সংসার, শান্ত জীবন, আর ভালোবাসায় ভরা ভবিষ্যৎ।
কিন্তু অনামিকার চোখের গভীরে অন্য এক গল্প লুকিয়ে ছিল।
যে গল্প কুদ্দুস কখনও পড়তে পারেনি।
অনামিকা বাইরে থেকে শান্ত ও নম্র হলেও ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা বয়ে বেড়াত। মাঝে মাঝেই সে একা ছাদে দাঁড়িয়ে মোবাইল হাতে দীর্ঘ সময় কাটাত। কুদ্দুস ভাবত, হয়তো পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলছে। কিন্তু কখনও জানতে চাইত না। কারণ, বিশ্বাস করতে সে ভালোবাসত।
এক রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। চারদিকে ঝমঝম শব্দ। কুদ্দুস বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়ে, অনামিকা ঘরের ভেতর ফিসফিস করে কারও সঙ্গে কথা বলছে। দরজা আধখোলা ছিল।
অনামিকার কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা।
—“আর কদিন অপেক্ষা করো মামুন… সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কুদ্দুস নামটা শুনে থমকে যায়। বুকের ভেতর হালকা কাঁপন ওঠে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে বুঝ দেয়—“হয়তো আত্মীয় কেউ।”
কারণ ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়।
সেদিন রাতে কুদ্দুস অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেনি। তবুও নিজের মনে সন্দেহকে জায়গা দেয়নি। সে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল, অনামিকা তাকে কখনও ঠকাবে না।
পরদিন সকালে অনামিকা যেন কিছুই হয়নি এমন স্বাভাবিক আচরণ করল। হাসিমুখে বলল,
—“আজ বাগানের ফুলগুলো অনেক সুন্দর লাগছে।”
কুদ্দুস মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল,
—“আপনি থাকলে সবকিছুই সুন্দর লাগে।”
অনামিকা মৃদু হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে যেন কোথাও একফোঁটা ক্লান্তি ছিল।
দিন যেতে থাকে।
কুদ্দুস নিজের সমস্ত সময় অনামিকাকে ঘিরেই কাটাতে শুরু করে। গ্রামের বাজারে গেলে তার জন্য শাড়ি কিনে আনে, শহর থেকে দামি সুগন্ধি আনে। অনামিকার পছন্দের প্রতিটি জিনিস সে মনে রাখত।
অন্যদিকে অনামিকা গভীর রাতে গোপনে কারও সঙ্গে কথা বলত। অনেক সময় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ আকাশ দেখত। তার চোখে তখন এক ধরনের অপেক্ষা দেখা যেত।
সেই অপেক্ষার নাম ছিল মামুন।
মামুন ছিল অনামিকার পুরোনো প্রেমিক। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাদের পরিচয় হয়েছিল। দু’জন একসময় স্বপ্ন দেখেছিল একসঙ্গে জীবন কাটানোর। কিন্তু দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার কারণে মামুন কখনও স্থির হতে পারেনি। চাকরি না থাকায় অনামিকার পরিবারও সম্পর্কটি মেনে নেয়নি।
ঠিক সেই সময় কুদ্দুসের জীবনে আসে অনামিকা।
অনামিকা বুঝতে পেরেছিল, কুদ্দুস সহজ-সরল মানুষ। তাকে বিশ্বাস করানো কঠিন নয়। আর কুদ্দুসের বিপুল সম্পত্তি অনামিকার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
তবুও অনামিকার ভেতরে মাঝে মাঝে অপরাধবোধ কাজ করত। যখন কুদ্দুস নিষ্পাপ চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলত—
—“তুমি ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারি না।”
তখন অনামিকার বুকের ভেতর হালকা ব্যথা উঠত।
কিন্তু সেই ব্যথার চেয়ে মামুনের প্রতি তার টান ছিল আরও গভীর।
এক সন্ধ্যায় মামুন গোপনে বাগানবাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে আসে। অনামিকা আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। কুদ্দুস তখন বাজারে।
মামুন বিরক্ত গলায় বলল,
—“আর কতদিন এভাবে চলবে?”
অনামিকা নিচু স্বরে বলল,
—“সব সম্পত্তি এখন আমার নামে। একটু সময় দাও।”
মামুন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
—“তুমি কি ওর প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছ?”
অনামিকা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“না। কিন্তু মানুষটা খুব ভালো।”
মামুন ঠান্ডা হেসে বলল,
—“ভালো মানুষ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ঠকে।”
কথাটা শুনে অনামিকা অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে যায়।
ঠিক তখনই দূরে কুদ্দুসের গাড়ির শব্দ ভেসে আসে। মামুন দ্রুত অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
অনামিকা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে।
কুদ্দুস হাতে ফুল নিয়ে ঘরে ঢুকে হাসিমুখে বলল,
—“দেখো, তোমার পছন্দের সাদা গোলাপ এনেছি।”
অনামিকা ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কেন যেন তার বুকের ভেতর হঠাৎ ভারী লাগে।
কুদ্দুস বুঝতে পারেনি কিছুই। সে আনন্দ নিয়ে গল্প করতে থাকে।
এভাবেই প্রতিদিন দুই পৃথিবী পাশাপাশি চলতে থাকে—একদিকে কুদ্দুসের নিষ্পাপ ভালোবাসা, অন্যদিকে অনামিকার গোপন প্রতীক্ষা।
বাগানবাড়ির প্রতিটি কোণ কুদ্দুস সাজাচ্ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্নে। সে নতুন আসবাব কিনছিল, ঘরের দেয়ালে নতুন রঙ করাচ্ছিল। এমনকি বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি পুকুর খননের পরিকল্পনাও করছিল।
সে ভাবত, একদিন এই বাড়িতে তাদের সন্তান দৌড়াবে।
অথচ অনামিকা রাতের পর রাত মামুনের জন্য অপেক্ষা করত।
মাঝে মাঝে গভীর রাতে মোবাইল হাতে বারান্দায় বসে কাঁদতও। হয়তো নিজের জীবনের দ্বন্দ্ব তাকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দিচ্ছিল।
একদিকে স্বার্থ, অন্যদিকে একজন নিরীহ মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
কিন্তু মানুষ যখন স্বার্থের পথে হাঁটে, তখন হৃদয়ের কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়।
একদিন কুদ্দুস খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় শুয়ে ছিল সে। অনামিকা তার মাথায় পানি দিচ্ছিল।
কুদ্দুস দুর্বল কণ্ঠে বলল,
—“তুমি পাশে আছো বলেই বেঁচে আছি।”
অনামিকার হাত থেমে যায় মুহূর্তের জন্য।
কেন যেন তার চোখ ভিজে ওঠে।
কিন্তু ঠিক তখনই মোবাইলে একটি মেসেজ আসে।
“আমি অপেক্ষা করছি।” —মামুন।
অনামিকা দ্রুত ফোন লুকিয়ে ফেলে।
কুদ্দুস কিছু বুঝতে পারেনি। সে শুধু অনামিকার হাতটা শক্ত করে ধরে ছিল।
সেই মুহূর্তে অনামিকার মনে হয়েছিল, সে হয়তো ভয়ংকর অন্যায় করছে। কিন্তু সে আর ফিরে আসতে পারছিল না।
ভালোবাসা, লোভ আর প্রতারণার জটিল খেলায় সে নিজেও আটকে গিয়েছিল।
দিনের আলোয় অনামিকা ছিল কুদ্দুসের স্বপ্নের মানুষ। আর রাতের অন্ধকারে সে হয়ে উঠত মামুনের প্রতীক্ষায় ডুবে থাকা এক নারী।
বাগানবাড়ির ফুলগুলো নীরবে সবকিছু দেখত।
প্রতিটি গোলাপ যেন কুদ্দুসের সরল বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ফুটে থাকত। অথচ সেই বিশ্বাসের মাটির নিচেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল এক ভয়ংকর ট্রাজেডি।
কুদ্দুস তখনও জানত না, যার জন্য সে নিজের পৃথিবী বিলিয়ে দিয়েছে, সেই মানুষটাই তাকে একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্ব মানুষে পরিণত করবে।
আর অনামিকা?
সে প্রতিটি দীর্ঘ রাতে শুধু অপেক্ষা করছিল—কবে সব শেষ হবে, আর কবে সে মামুনের সঙ্গে নতুন জীবনে পা রাখবে।
চলবে...........