ঢাকা, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬,
সময়: ০২:০২:০০ PM

বাগানবাড়ি

মান্নান মারুফ
08-05-2026 12:31:01 PM
বাগানবাড়ি

তৃতীয় পর্ব 

সেদিনের সন্ধ্যাটা অন্যসব দিনের মতো ছিল না। আকাশজুড়ে ছিল মেঘের ভার, বাতাসে এক ধরনের অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। বাগানবাড়ির ফুলগুলোও যেন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। কুদ্দুস বারান্দায় বসে চুপচাপ দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার বুকের ভেতর কয়েকদিন ধরেই অজানা এক অস্থিরতা কাজ করছিল।

মানুষের মন অনেক সময় এমন কিছু টের পায়, যা চোখে দেখা যায় না।

অনামিকা সেদিন বিকেল থেকেই অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। কথা কম বলছিল, চোখে চোখ রাখছিল না। কুদ্দুস কয়েকবার জানতে চেয়েছিল,
—“
তোমার শরীর খারাপ?”

অনামিকা শুধু ছোট করে বলেছিল,
—“
না, কিছু হয়নি।

কিন্তু কুদ্দুস বুঝতে পারছিল, কিছু একটা বদলে গেছে।

সন্ধ্যার একটু আগে অনামিকা বলল,
—“
আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।

কুদ্দুস অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“
এত রাতে কোথায় যাবে?”

—“একজন পরিচিত অসুস্থ। দেখে আসব।

কথাটা বলে দ্রুত বেরিয়ে যায় অনামিকা।

কুদ্দুস আর কিছু বলেনি। কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে। কেন যেন মনে হচ্ছিল, আজ কিছু একটা ঘটবে।

অনেকক্ষণ বারান্দায় বসে থাকার পর হঠাৎ সে সিদ্ধান্ত নেয় অনামিকার পিছু নেবে।

নিজের এই আচরণে সে নিজেই লজ্জা পাচ্ছিল। কারণ, সে কখনও কাউকে সন্দেহ করতে শেখেনি। তবুও বুকের ভেতরের ভয় তাকে শান্ত থাকতে দিল না।

রাত তখন প্রায় আটটা।

দূরের আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। কুদ্দুস ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের শেষ মাথার পুরোনো রাস্তার দিকে এগোয়। কিছুদূর যেতেই সে দেখতে পায়, বড় আমগাছটার নিচে একজন দাঁড়িয়ে আছে।

লোকটি মামুন।

আর তার সামনে দাঁড়িয়ে অনামিকা।

কুদ্দুসের বুক ধক করে ওঠে।

সে অন্ধকারে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাতাসে ভেসে আসে তাদের কথার শব্দ।

মামুন বিরক্ত কণ্ঠে বলছিল,
—“
আর কতদিন এই নাটক করবে?”

অনামিকা ক্লান্ত গলায় বলল,
—“
আমি চেষ্টা করছি সব শেষ করতে।

—“সব তো তোমার নামে হয়ে গেছে। এখন আর সমস্যা কোথায়?”

অনামিকা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর নিচু স্বরে বলে,
—“
কুদ্দুস মানুষটা খুব ভালো।

মামুন হেসে ওঠে। সেই হাসিতে ছিল বিদ্রুপ।

—“ভালো মানুষ? তুমি কি ওকে ভালোবেসে ফেলেছ?”

অনামিকা দ্রুত মাথা নাড়ে।
—“
না! কখনোই না। আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।

কুদ্দুসের পৃথিবী ঠিক সেই মুহূর্তে থেমে যায়।

মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের ভেতর ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে।

সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

যে মেয়েটির হাসিতে সে জীবন খুঁজে পেয়েছিল, যার জন্য নিজের সমস্ত সম্পত্তি লিখে দিয়েছে, সেই মেয়েটি বলছেসে কখনোই তাকে ভালোবাসেনি।

বৃষ্টি পড়া শুরু হয়।

কুদ্দুস স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার কানে তখনও অনামিকার কণ্ঠ ভেসে আসছে।

—“আর কিছুদিন অপেক্ষা করো মামুন। তারপর আমরা দূরে কোথাও চলে যাব।

মামুন অনামিকার হাত ধরে বলল,
—“
আমি শুধু তোমাকেই চাই।

এই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারল না কুদ্দুস।

তার মাথার ভেতর যেন সবকিছু ভেঙে পড়তে থাকে। চারপাশ ঝাপসা হয়ে যায়। বৃষ্টির পানির সঙ্গে কখন যে তার চোখের পানি মিশে গিয়েছিল, সে বুঝতেই পারেনি।

ধীরে ধীরে পেছনে সরে আসে সে।

কোনো শব্দ করেনি। কোনো প্রশ্ন করেনি। শুধু নিঃশব্দে হেঁটে চলে আসে নিজের বাগানবাড়িতে।

সেদিন বাড়িটা ভীষণ অচেনা লাগছিল।

যে বাড়ির প্রতিটি ইট সে ভালোবাসা দিয়ে গড়েছিল, আজ সেই বাড়ির দেয়ালগুলোও যেন তাকে উপহাস করছে।

ঘরে ঢুকে কুদ্দুস চুপচাপ বসে থাকে।

চারদিকে নিস্তব্ধতা।

হঠাৎ তার চোখ পড়ে দেয়ালে টাঙানো অনামিকার ছবির দিকে। ছবিতে অনামিকা হাসছে।

সেই হাসি একসময় তার কাছে জীবনের আলো ছিল। অথচ আজ সেই হাসিই যেন ভয়ংকর প্রতারণার প্রতীক।

কুদ্দুস ধীরে ধীরে ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

কাঁপা গলায় বলে,
—“
তাহলে সব মিথ্যে ছিল?”

তার কণ্ঠ ভেঙে যায়।

সারা রাত সে ঘুমাতে পারেনি। বিছানায় বসে শুধু অতীতের প্রতিটি মুহূর্ত মনে করতে থাকে।

অনামিকার প্রথম দেখা।

তার হাসি।

বাগানের ফুল নিয়ে কথা বলা।

মাথায় হাত রেখে বলা—“আপনি খুব ভালো মানুষ।

সবকিছু আজ অভিনয় মনে হচ্ছিল।

মানুষ যখন কাউকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, তখন প্রতারণার আঘাত সবচেয়ে গভীরে লাগে।

কুদ্দুসের মনে হচ্ছিল, তার অস্তিত্বটাই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

ভোরের দিকে অনামিকা বাড়ি ফিরে আসে।

কুদ্দুস তখনও বারান্দায় বসে।

অনামিকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“
আপনি ঘুমাননি?”

কুদ্দুস ধীরে ধীরে মাথা তোলে।

তার চোখ দুটো লাল হয়ে ছিল।

অনামিকা প্রথমবার ভয় পেয়ে যায়।

কুদ্দুস শান্ত গলায় বলল,
—“
মামুন কে?”

প্রশ্নটা শুনে অনামিকার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর কুদ্দুস আবার বলল,
—“
গতকাল সব শুনেছি।

অনামিকা চুপ।

সে বুঝতে পারে, আর কিছু লুকানোর নেই।

কুদ্দুস কাঁপা গলায় বলে,
—“
একবার শুধু সত্যিটা বলোতুমি কি কখনো আমাকে ভালোবেসেছিলে?”

অনামিকার ঠোঁট কেঁপে ওঠে।

সে চোখ নিচু করে ফেলে।

অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে বলে,
—“
না।

এই একটি শব্দ কুদ্দুসের ভেতরের শেষ আশাটুকুও ভেঙে দেয়।

মনে হলো, পৃথিবীটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেছে।

কুদ্দুস স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।

অনামিকা এবার বলল,
—“
আমি মামুনকে ভালোবাসি। অনেক আগে থেকেই।

—“তাহলে আমার জীবনে এলে কেন?”

অনামিকা উত্তর দিতে পারে না।

কুদ্দুস তীব্র কষ্টে বলে,
—“
আমার ভালোবাসা নিয়ে খেললে কেন?”

অনামিকার চোখে জল চলে আসে।

—“আমি বাধ্য ছিলাম…”

কুদ্দুস হঠাৎ তিক্ত হেসে ওঠে।

—“বাধ্য? তাই আমার সবকিছু নিয়ে নিলে?”

তার কণ্ঠে কান্না মিশে ছিল।

অনামিকা কিছু বলতে চেয়েও থেমে যায়।

কারণ, সত্যিই তার কোনো উত্তর ছিল না।

কুদ্দুস ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।

তার চোখে তখন ভয়ংকর শূন্যতা।

সে বলল,
—“
জানো অনামিকাআমি মানুষকে ভয় পাই না। আমি ভয় পাই মানুষের মুখোশকে।

অনামিকা কাঁদতে শুরু করে।

কিন্তু সেই কান্না আর কুদ্দুসের হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি।

কারণ, বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে মানুষ আর আগের মতো থাকে না।

সেদিন সকালেই কুদ্দুস প্রথমবার নিজের ভেতরে অদ্ভুত পরিবর্তন অনুভব করে।

সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকায়।

সেই চোখে আর আগের সরলতা নেই।

শুধু গভীর ক্লান্তি।

বাগানবাড়ির প্রতিটি ফুল সেদিন ঝরে পড়ছিল। যেন তারাও বুঝতে পেরেছিল, এই বাড়ির ভালোবাসা আজ মৃত।

অনামিকা নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে কাঁদছিল।

আর কুদ্দুস বারান্দায় বসে ফ্যালফ্যাল করে আকাশ দেখছিল।

তার মনে হচ্ছিল, সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্ব মানুষ।

কারণ, সম্পদ হারালে মানুষ আবার ফিরে পেতে পারে।

কিন্তু হৃদয়ের বিশ্বাস ভেঙে গেলে মানুষ আর কখনও পুরোপুরি বাঁচতে পারে না।

সেদিনের সেই সন্ধ্যাই কুদ্দুসের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

সেই সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে তার ভেতরের মানুষটা মারা যেতে শুরু করে।

আর জন্ম নিতে থাকে এক নিঃস্ব, ভাঙা, একাকী মানুষযে আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারবে না কোনোদিন।

চলবে...........