ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬,
সময়: ০৪:৫৪:১৪ PM

উপন্যাস, ”বেয়াদব”

মান্নান মারুফ
15-05-2026 03:39:35 PM
উপন্যাস, ”বেয়াদব”

দ্বিতীয় পর্ব 

শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ভবনটা দূর থেকে দেখলে মনে হতো ইতিহাস এখনও বেঁচে আছে। দেয়ালের রং উঠে গেছে, বারান্দার লোহার গ্রিলে মরিচা ধরেছে, তবু ভবনটার মধ্যে এক ধরনের অহংকার ছিল। যেন সে এখনও বুক ফুলিয়ে বলতে চায়—
“এই শহরের সভ্য মানুষদের ঠিকানা আমি।”

ঐতিহ্যবাহী সেই প্রেসক্লাবের নাম উচ্চারণ করলেও অনেকের গলায় শ্রদ্ধা চলে আসত। এখানে একসময় সত্যিকারের পেশাজীবীরা বসতেন। দেশের বড় বড় আন্দোলনের পরিকল্পনা হতো এই ভবনের ধোঁয়াভরা কক্ষে। অনেক কিংবদন্তি সাংবাদিক এই ক্লাবের সদস্য ছিলেন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের রং শুধু ওঠেনি, নীতির রংও ফিকে হয়ে গেছে।

এখন এখানে আদর্শের চেয়ে পরিচয় বড়, যোগ্যতার চেয়ে তদবির শক্তিশালী। দলবাজির কথা ও অসৎ অর্থের লেন দেনের কথা নাই বললাম।

আর সেই ক্লাবের অঘোষিত সম্রাট ছিলেন— রশীদ সাহেব।

মুখে সবসময় নীতির কথা বলতেন। বক্তৃতা দিলে মনে হতো সততার শেষ বাতিঘর যেন তিনিই।
কিন্তু তার চোখের গভীরে সবসময় একটা ভয় লুকিয়ে থাকত।
সেই ভয়—যোগ্য মানুষের।

কারণ যোগ্য মানুষ মাথা নত করে না।

রশীদ সাহেব তাই নিজের চারপাশে এমন মানুষ রাখতেন, যারা সবসময় “জি স্যার” বলতে জানে। যারা চেয়ার দেখে সালাম দেয়, মানুষ দেখে নয়।

কুদ্দুস ছিল সেই হিসাবের বাইরের একজন।

পঁয়ত্রিশ বছর ধরে পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষটা এই ক্লাবে এসেছে, বারান্দায় ঘুরে বেড়িয়েছে তার হিসাব কেউ রাখেনি। আন্দোলনের সময় রাস্তায় ছিল, সাংবাদিক নির্যাতনের সময় সামনে ছিল কুদ্দুসের পদচারন, মানুষের সংকটে টাকা তুলেছে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে—সব করেছে নিঃস্বার্থভাবে।

কিন্তু সদস্যপদের তালিকায় তার নাম কখনো জায়গা পায়নি।

প্রতিবারই একটা অদৃশ্য তালা দরজার সামনে এসে দাঁড়াত।

সেদিন ক্লাবে নতুন সদস্য নির্বাচনের বৈঠক চলছিল। লম্বা টেবিলের চারপাশে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বসে আছেন। কারও হাতে দামি সিগারেট, কারও সামনে বিদেশি কফি।

রশীদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,

—আর কোনো নাম আছে?

একজন ফাইল উল্টাতে উল্টাতে বলল,

—জি, কুদ্দুসের নামও এসেছে।

ঘরের ভেতর হালকা নীরবতা নেমে এলো।

তারপর কেউ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।

—লোকটা খুব ঝামেলাপ্রিয়।

আরেকজন বলল,

—সব জায়গায় সত্য কথা বলতে যায়। ক্লাবের পরিবেশ নষ্ট হবে।

রশীদ সাহেব চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীর গলায় বললেন,

—দেখেন, ক্লাবে শুধু যোগ্য হলেই হয় নাৃ আচরণও লাগে।

“আচরণ” শব্দটা শুনে কয়েকজন মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

এখানে আচরণের মানে সবাই জানত—
ক্ষমতাবানদের সামনে নরম হওয়া, অন্যায়ের সময় চুপ থাকা, প্রয়োজন হলে মিথ্যা প্রশংসা করা।

কুদ্দুস এগুলোর একটাও পারে না।

তাই তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ—সে স্বাধীন মানুষ।

বৈঠকের এক কোণে বসা এক বৃদ্ধ সদস্য সাহস করে বললেন,

—কিন্তু কুদ্দুস তো দীর্ঘদিনের পেশাজীবী। তার অবদানও কম না।

রশীদ সাহেব এবার মৃদু হাসলেন।

—অবদান থাকলেই তো আর সদস্য করা যায় না।

বৃদ্ধ লোকটা চুপ করে গেলেন।

কারণ তিনি জানতেন, সিদ্ধান্ত আগেই হয়ে গেছে। এই বৈঠক শুধু নাটক।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে। ক্লাবের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কুদ্দুস সিগারেট ধরাল। সে জানত ভেতরে তার নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবু তার মুখে উদ্বেগ ছিল না।

এই শহর তাকে অনেক আগেই শিখিয়েছে—
যোগ্যতা দরজা খুলে না, দরজা খোলে তোষামোদে।

বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা জসিম কাছে এলো। লোকটা সবসময় ক্ষমতাবানদের আশেপাশে ঘোরে। মুখে হাসি, চোখে হিসাব।

—কুদ্দুস ভাই, একটা কথা কই?

—কন।

—আপনি একটু নরম হইলে সমস্যা কী? রশীদ সাহেবরে দুইটা ভালো কথা বললে সদস্য হইয়া যাইতেন।

কুদ্দুস ধোঁয়া ছেড়ে তাকাল।

—আমি মানুষরে সম্মান দেই, পা চাটি না।

জসিম বিব্রত হেসে বলল,

—এই জন্যই তো পিছাইয়া আছেন।

কুদ্দুস শান্ত স্বরে উত্তর দিল,

—সবাই সামনে গেলেই মানুষ হয় না জসিম। কেউ কেউ পিছাইয়া থেকেও মাথা উঁচু রাখে।

জসিম আর কথা খুঁজে পেল না।

ভেতরে তখন ভোটাভুটি শেষ। কয়েকজন নতুন সদস্যের নাম ঘোষণা হলো।
তাদের একজন ব্যবসায়ী, যার পেশার সঙ্গে ক্লাবের সম্পর্কই নেই। আরেকজন এক নেতার ভাগনে। আরেকজন নিয়মিত ক্লাবে মদের বিল পরিশোধ করে।

কুদ্দুসের নাম নেই।

ঘোষণা শুনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—আহারে! আবারও হইল না।

তাদের চোখে দুঃখের চেয়ে আনন্দ বেশি ছিল।

মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে—
যোগ্য মানুষকে আটকে দিতে পারলে নিজের অযোগ্যতাটা কিছুক্ষণ ঢাকা পড়ে।

কুদ্দুস ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।

কেউ তাকে থামিয়ে বলল,

—মন খারাপ কইরেন না ভাই।

কুদ্দুস হালকা হাসল।

—মন খারাপ করি নাই। আমি শুধু ক্লাবটার জন্য আফসোস করি।

—কেন?

—যে প্রতিষ্ঠান যোগ্য মানুষরে ভয় পায়, সেই প্রতিষ্ঠানের পতন শুরু হইয়া গেছে।

কথাটা শুনে লোকটা চুপ হয়ে গেল।

রাত বাড়ছিল। ক্লাবের ভেতরে তখন হাসাহাসি চলছে। নতুন সদস্যরা বড় ভাইদের সালাম দিচ্ছে। কেউ কেউ ছবি তুলছে।

কুদ্দুস রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ভবনটার দিকে একবার তাকাল।

তার মনে হলো, এই ভবনটা আর আগের মতো নেই। দেয়াল আছে, চেয়ার আছে, সাইনবোর্ড আছে—শুধু সম্মানের আত্মাটা নেই।

একসময় এই ক্লাবে মানুষ সত্য বলার সাহস নিয়ে ঢুকত।
এখন ঢোকে সুবিধা নেওয়ার কৌশল নিয়ে।

হাঁটতে হাঁটতে কুদ্দুসের মনে পড়ল তার বাবার কথা।

বাবা বলতেন,

“বাপ, জীবনে দরজার চেয়ে বিবেক বড়।
সব দরজায় ঢুকতে নাই।”

সেদিন কুদ্দুস প্রথমবার বুঝল, হয়তো সদস্য না হওয়াটা অপমান নয়—রক্ষা পাওয়া।

কারণ কিছু দরজা বন্ধ থাকাই ভালো।
সব দরজার ভেতরে আলো থাকে না।

পেছনে ক্লাবের আলো ঝলমল করছিল।
সামনে অন্ধকার রাস্তা।

কুদ্দুস অন্ধকার পথটাই বেছে নিল।
কারণ সে জানত—
মিথ্যার আলোয় দাঁড়ানোর চেয়ে সত্যের অন্ধকারে হাঁটা অনেক সম্মানের।

চলবে...........