পুলিশ সপ্তাহ চলাকালেই দেশের দুই জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) যোগদানের আগেই প্রত্যাহার হওয়ায় বাংলাদেশ পুলিশের ভেতরে নতুন করে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন ১৬ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনায় বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে অতীতে বিতর্ক, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা প্রশাসনিক অভিযোগে আলোচনায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে এই উদ্বেগ আরও বেশি বলে জানিয়েছেন একাধিক পুলিশ সদস্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে পুলিশ প্রশাসনে প্রত্যাহার, বদলি ও বাধ্যতামূলক অবসরের প্রবণতা বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক পরিচয়, শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগকে কেন্দ্র করে একের পর এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাহিনীর অভ্যন্তরে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পদোন্নতি, পদায়ন এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও। অনেক কর্মকর্তা এখন পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
সোমবার ফেনী ও পঞ্চগড় জেলার এসপি প্রত্যাহারের ঘটনায় সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায় ফেনীর এসপি হিসেবে নিয়োগ পেলেও পরে প্রত্যাহার হওয়া মাহবুব আলম খান বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত আছেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং এসব অভিযোগের জবাবও তিনি দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, মূলত তার পদোন্নতি ঠেকাতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পঞ্চগড়ের এসপি হিসেবে যোগদানের পর প্রত্যাহার হওয়া মিজানুর রহমানকেও বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি তাকে দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়নের জন্য তৎকালীন সংসদ সদস্য আবুল হাসান মাহমুদ আলী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে সুপারিশ করেছিলেন। সে সময় মিজানুর রহমান রাজশাহী অঞ্চলের ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সুপারিশপত্রে তাকে একজন দক্ষ ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরে তাকে দিনাজপুর জেলার এসপি পদে পদায়নও করা হয়েছিল।
পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিশেষ করে বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করা এসপিদের মধ্যে এখন বেশি আতঙ্ক কাজ করছে। একইসঙ্গে ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। কখন কার বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রশাসনিক ফাইল টেনে বের করা হবে—এমন আশঙ্কায় অনেকে নীরব অবস্থান নিয়েছেন। পদোন্নতির জন্য লবিং বা তদবিরও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে বলে জানা গেছে।
একজন এসপি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে সকালে পদোন্নতি হচ্ছে, আবার বিকেলে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কেউ আর পদোন্নতি চাইবে না।”
আরেকজন এসপি বলেন, “৫ আগস্টের পর যারা ঢাকার বাইরে পোস্টিং পেয়েছিলাম, তাদের অনেকেই এখন ডিএমপির বিভিন্ন জোনে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু সবসময় ভয় কাজ করে—কখন কোন ট্যাগ দিয়ে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।”
ডিবিতে কর্মরত একজন উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) বলেন, “এখন সবাই অনেক সতর্ক। ঢাকায় থেকেও কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে চায় না। ডিএমপির শত শত কর্মকর্তা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।”
এসপি প্রত্যাহারের ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এএফএম আনোয়ার হোসেন খানকে প্রত্যাহার করা হয়। একই সময়ে গণঅধিকার পরিষদের এক নেতার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।
একই বছরের ৩ আগস্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দেশত্যাগ ঘিরে বিতর্কের পর কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরীকেও প্রত্যাহার করা হয়। ওই ঘটনায় বিদেশযাত্রার অনুমতি ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পরে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া ইয়াবা চালান জব্দ এবং সেই মাদক বিক্রির অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগে ২০২৫ সালে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহকেও প্রত্যাহার করা হয়। একটি জাতীয় দৈনিকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। একই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার, যশোর, নীলফামারী ও সুনামগঞ্জ জেলার চার পুলিশ সুপারকে একযোগে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে সম্প্রতি পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার ১৬ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনায় প্রশাসনজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভিন্ন ইউনিট ও সংস্থায় দায়িত্ব পালনকারী একাধিক ডিআইজি, পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারও রয়েছেন।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা নেওয়া মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ। তিনি জানান, এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যথাযথ যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং কারও প্রতি অবিচার না হওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে একযোগে পাঁচজন অতিরিক্ত আইজিপিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও একাধিক ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজিকেও একইভাবে অবসরে পাঠানো হয়।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি একেএম আওলাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি পুলিশ সপ্তাহের বিভিন্ন সভায় ব্যস্ত ছিলেন। একইভাবে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খানকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক প্রত্যাহার, বদলি ও বাধ্যতামূলক অবসরের ধারাবাহিক ঘটনায় পুলিশ বাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনের ভেতরে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।