পর্ব-২
“হয়তো দেখা হত কম...”
মানুষের জীবনে কিছু বিকেল আসে, যেদিন হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে যায়। আকাশ একই থাকে, শহরের রাস্তাগুলোও আগের মতোই থাকে, শুধু কোনো একটি মানুষের অনুপস্থিতিতে পুরো পৃথিবীটাকেই অচেনা লাগে।
কুদ্দুসের জীবনেও তেমন একটি বিকেল এসেছিল।
সেদিন সে প্রতিদিনের মতো লাইব্রেরিতে গিয়েছিল। হাতে ছিল জীবনানন্দের কবিতার বই। মনে এক ধরনের অদ্ভুত অপেক্ষা—আজ হয়তো নিহারিকা নতুন কোনো কবিতার কথা বলবে, হয়তো আবার হেসে বলবে, “সব কথা বলা যায় না।”
কিন্তু সেদিন লাইব্রেরির কোণের টেবিলটা খালি ছিল।
প্রথমে কুদ্দুস বিষয়টা গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল, হয়তো আজ আসবে না। কিন্তু পরদিনও যখন নিহারিকা এল না, তার বুকের ভেতরে অজানা এক অস্বস্তি জমতে শুরু করল।
তৃতীয় দিন লাইব্রেরিয়ান নিজেই বললেন,
— “ওরা ঢাকায় চলে গেছে।”
কুদ্দুস চুপ করে রইল।
কথাটা খুব সাধারণভাবে বলা হয়েছিল, অথচ তার মনে হলো কেউ যেন বুকের ভেতর থেকে নিঃশব্দে কিছু ছিঁড়ে নিয়ে গেল।
— “হঠাৎ?”
সে ধীরে জিজ্ঞেস করল।
— “নিহারিকার বাবার বদলি হয়েছে। গতকাল রাতেই চলে গেছে।”
এরপর আর কিছু শোনেনি কুদ্দুস। লাইব্রেরির চারপাশের সব শব্দ কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন অনেকক্ষণ সে সেই খালি টেবিলটার দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। যেখানে নিহারিকা বসে বই পড়ত। টেবিলের কোণে এখনও একটি শুকনো কদম ফুল পড়ে ছিল।
হয়তো শেষ দিন ভুলে রেখে গেছে।
কুদ্দুস ফুলটা হাতে তুলে নিল।
তার মনে হলো, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের ছোঁয়া থেকে যায়।
ঢাকায় যাওয়ার এক সপ্তাহ পর প্রথম চিঠি এসেছিল।
সাদা খামে ছোট্ট করে লেখা—
“কুদ্দুসের জন্য।”
কাঁপা হাতে খাম খুলেছিল সে।
ভেতরে নীল কালিতে লেখা কয়েকটি লাইন—
“এই শহর খুব বড়, খুব ব্যস্ত। এখানে আকাশটাও যেন পুরো দেখা যায় না। তবুও মাঝে মাঝে মনে হয়, কালীগঞ্জের সেই লাইব্রেরির জানালার পাশে এখনও কেউ নিশ্চুপ বসে আছে।
— নিহারিকা”
চিঠিটা পড়ে কুদ্দুস দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে ছিল।
তার জীবনে এই প্রথম কেউ তাকে চিঠি লিখেছে।
আর সেই মানুষটা হাজার মাইল দূরে থেকেও তার এত কাছে।
সেদিন রাতে সে উত্তর লিখল।
অনেকবার কাগজ ছিঁড়ল। অনেক কথা লিখেও কেটে দিল। শেষে শুধু লিখল—
“লাইব্রেরির কোণের টেবিলটা এখনও খালি থাকে। কেউ সেখানে বসে না।
— কুদ্দুস”
খুব সাধারণ একটি চিঠি।
কিন্তু সেই অল্প কথার ভেতরেই ছিল এক সমুদ্র অপেক্ষা।
এরপর শুরু হলো চিঠির দিন।
মাসে দু-তিনবার চিঠি আসত। কখনো কবিতার লাইন, কখনো শহরের গল্প, কখনো নিঃসঙ্গতার কথা।
নিহারিকা লিখত—
“ঢাকার বৃষ্টি সুন্দর, কিন্তু এখানে বৃষ্টির শব্দে তোমার শহরের মতো মাটির গন্ধ পাই না।”
আবার কখনো লিখত—
“তুমি কি এখনও বিকেলে লাইব্রেরিতে যাও?”
কুদ্দুস প্রতিটি চিঠি খুব যত্ন করে রেখে দিত। পুরোনো টিনের বাক্সে। যেন কাগজ নয়, হৃদয়ের টুকরো জমিয়ে রাখছে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিঠির দূরত্বও বাড়তে লাগল।
আগে যেখানে সপ্তাহে উত্তর আসত, এখন মাস পেরিয়ে যায়।
কুদ্দুস প্রতিদিন বিকেলে ডাকপিয়নের অপেক্ষা করত। দূর থেকে সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ শুনলেই বুক কেঁপে উঠত।
কিন্তু অধিকাংশ দিনই হতাশ হতে হতো।
তবুও সে অপেক্ষা করত।
কারণ ভালোবাসা কখনো কখনো অপেক্ষার অন্য নাম।
একদিন সন্ধ্যায় খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বিদ্যুৎ ছিল না। কুদ্দুস জানালার পাশে বসে ছিল।
হঠাৎ ডাকপিয়ন এসে একটি চিঠি দিয়ে গেল।
নিহারিকার লেখা।
চিঠিটা ভেজা ছিল। হয়তো বৃষ্টিতে ভিজেছে।
সে ধীরে খুলল।
“কুদ্দুস,
জানো, এই শহরে অনেক মানুষ আছে। তবুও মাঝে মাঝে খুব একা লাগে। এখানে সবাই খুব ব্যস্ত। কেউ কারও দিকে তাকায় না।
কখনো কখনো মনে হয়, ছোট শহরের নীরবতাগুলোই বেশি আপন ছিল।
তুমি কি আমাকে এখনও মনে রাখো?”
শেষ লাইনটা পড়ে কুদ্দুসের বুক কেঁপে উঠল।
সে জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির অন্ধকারে দূরের আলো ঝাপসা হয়ে ছিল।
তার খুব ইচ্ছে হলো লিখতে—
“তোমাকে ভুলে থাকা যায় না।”
কিন্তু সে লিখল না।
শুধু উত্তর দিল—
“কিছু মানুষকে মনে রাখতে হয় না। তারা এমনিতেই মনে থাকে।”
সময় ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল।
নিহারিকার পড়াশোনা বেড়ে গেল। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন জীবন।
চিঠিও কমে এলো।
কুদ্দুস কখনো অভিমান করত না মুখে। কিন্তু গভীর রাতে টিনের বাক্স খুলে পুরোনো চিঠিগুলো পড়ত।
একই লাইন বারবার পড়ত।
তার মনে হতো, দূরত্ব মানুষকে আলাদা করে না, নীরব করে দেয়।
একদিন লাইব্রেরিতে বসে থাকতে থাকতে সে খেয়াল করল, আগের মতো আর বইয়ে মন বসে না। কোনো কবিতার লাইন পড়লেই নিহারিকার কথা মনে পড়ে।
“মনে থাকা” ব্যাপারটা এত কষ্টেরও হতে পারে, সে আগে জানত না।
শীতের এক সকালে হঠাৎ অনেকদিন পর আবার চিঠি এলো।
খামের ভেতরে ছোট্ট একটি শুকনো শিউলি ফুল।
আর কয়েকটি লাইন—
“ভালোবাসা সবসময় কাছে থাকার নাম না, তাই না?
কখনো কখনো দূরে থেকেও কেউ খুব আপন হয়ে থাকে।”
কুদ্দুস চিঠিটা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে রইল।
তার মনে হলো, এই দূরত্বের মাঝেও তারা একে অপরের ভেতরে ঠিকই রয়ে গেছে।
হয়তো দেখা হয় না।
হয়তো প্রতিদিন কথা হয় না।
তবুও গভীর রাতের নিস্তব্ধতায়, কোনো কবিতার লাইনে, কিংবা বৃষ্টির শব্দে—দু’জন মানুষ নিঃশব্দে একে অপরকে অনুভব করে যাচ্ছে।
সেই অনুভবের কোনো নাম নেই।
শুধু আছে এক অদ্ভুত টান।
যে টান মানুষকে দূরে রেখেও অন্তরের খুব কাছে এনে দেয়।
চলবে......