বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বরাবরই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরেও এবার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। অতীতে সংসদ নির্বাচনে জোটভিত্তিক রাজনীতি, আসন সমঝোতা ও কৌশলগত সমন্বয়ের চিত্র দেখা গেলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো আলাদা অবস্থান নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে পৃথকভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
নির্বাচন কমিশন আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন বাতিল হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দলীয় প্রতীক না থাকলেও প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন থাকছে না; বরং এই ব্যবস্থাকে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে দলগুলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক বাতিল হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তি জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং তৃণমূল সংগঠনের শক্তি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রভাবের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতির বাস্তবতাও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের ধারাবাহিকতা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ধরে রাখতে চায় বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, জাতীয় পর্যায়ে সরকারের জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে স্থানীয় নির্বাচনেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রস্তুত এবং তৃণমূলের কোন্দল নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছে। জনপ্রিয়, গ্রহণযোগ্য এবং বিতর্কমুক্ত প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ দলীয় প্রতীক না থাকায় ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে।
এদিকে সম্ভাব্য প্রার্থীরাও আগেভাগে মাঠে নেমে পড়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং স্থানীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন তারা। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, সরকারের গত কয়েক মাসের কর্মকাণ্ড এবং দেশ পরিচালনায় তারেক রহমানের পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরেই ভোটারদের আস্থা অর্জনের কৌশল নেওয়া হবে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং তফসিল ঘোষণার পর পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নামবেন নেতাকর্মীরা। তার মতে, সরকারের ইতিবাচক কার্যক্রমের কারণে অধিকাংশ এলাকায় বিএনপির সমর্থিত প্রার্থীরাই বিজয়ী হবেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। বিগত সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটে অংশ নিলেও স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
জামায়াত ইতোমধ্যে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত করেছে। তরুণ নেতৃত্ব এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার দুই সিটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
দলটির নেতারা মনে করছেন, অতীতে জোটের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করেই তারা বেশি সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন করতে পেরেছিলেন। ফলে এবারের নির্বাচনকে তারা নিজেদের ভোটব্যাংক ও সাংগঠনিক অবস্থান পরিমাপের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের জন্য প্রার্থী নির্ধারণের কাজ চলছে এবং দল এককভাবেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি চমক দেখিয়েছে। দলটি ইতোমধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়র পদে ১০০ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এটিকে আগাম প্রস্তুতির বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকার দুই সিটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে এনসিপি বোঝাতে চেয়েছে যে তারা কেবল জাতীয় পর্যায়েই নয়, স্থানীয় পর্যায়েও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে চায়। দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন জানিয়েছেন, তারা এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রয়োজন হলে জোটগত সমঝোতার পথও পুরোপুরি বন্ধ রাখা হচ্ছে না।
এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সারজিস আলম বলেছেন, যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সমঝোতার জন্য কোনো আসনে ছাড় দেওয়া হবে না; দলীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলীয় প্রতীক বাতিল হওয়ায় এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ প্রতিটি দল এখন তৃণমূলের প্রকৃত শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের গুরুত্ব বাড়বে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন, প্রায় ৪৯০টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টির মতো পৌরসভা এবং ৬১টি জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি হাজার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনও সামনে রয়েছে।
আইন সংশোধনের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিধান বাতিল করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অতীতে দলীয় প্রতীকভিত্তিক নির্বাচনের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে বিভাজন, প্রতিহিংসা এবং কেন্দ্রীয় নির্ভরতা বেড়েছিল। এখন ব্যক্তি যোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততা নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনসমর্থন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে। জোটের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে একক লড়াইয়ের এই প্রবণতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।