ঢাকা, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬,
সময়: ১০:৫৭:৫৩ PM

ত্যাগীদের মূল্যায়নে যুবদলের নতুন কমিটি

মান্নান মারুফ
23-05-2026 09:35:48 PM
ত্যাগীদের মূল্যায়নে যুবদলের নতুন কমিটি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখন সরকার ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত সময় পার করছে। এর প্রভাব পড়েছে দলটির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা সংগঠনগুলোকে পুনরায় গতিশীল করতে এবার সক্রিয় হয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী যুবদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনকে ঘিরে দলটির অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা, গুঞ্জন ও তৎপরতা শুরু হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংগঠনকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে নতুন নেতৃত্ব আনার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে “এক নেতা এক পদ” নীতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বর্তমান কমিটির শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুবদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় পরেও তিনি যুবদলের সভাপতি হওয়ার সম্ভবনা বেশি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন সরকার পরিচালনায় থাকায় দলীয় সংগঠনগুলোকে আরও দক্ষ, কার্যকর ও জনসম্পৃক্ত করে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। সেই বিবেচনায় যুবদলসহ অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের পুনর্গঠনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৯ জুলাই আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নূরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে প্রায় ২২ মাস অতিবাহিত হলেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ রূপ না পাওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেক নেতাকর্মী এটিকে বর্তমান নেতৃত্বের সাংগঠনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।

যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির একটি তালিকা বিএনপির  চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে জমা দিয়েছেন। অনুমোদন পেলেই তা প্রকাশ করা হবে। তবে একই সঙ্গে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের বিষয়েও হাইকমান্ড চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা গেছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, যুবদলের আগামী নেতৃত্ব নির্ধারণে তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, বর্তমান কমিটির বিতর্কহীন, নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। দ্বিতীয়ত, সাবেক প্রভাবশালী ছাত্রদল নেতাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনে কাজ করেও পরিচয়ের আড়ালে থাকা দক্ষ সংগঠকদের সামনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী, মামলা-হামলার শিকার এবং দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল। দলের অভ্যন্তরে এটিকে “ত্যাগীদের মূল্যায়ন” নীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি পদে কয়েকজন নেতার নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। এদের মধ্যে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মামুন হাসান, বর্তমান সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল কবীর পল এবং মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক গোলাম মাওলা শাহীনসহ অনেকে আলোচনায় রয়েছে। 

সাধারণ সম্পাদক পদেও চলছে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা। আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক খন্দকার এনামুল হক এনাম, যুবদলের নির্বাহী কমিটির প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেল্লাল হোসেন তারেক এবং ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের নেতৃত্ব নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে। সভাপতি পদে বর্তমান সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ গাফফার, যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন বাবলু, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সজল এবং সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আসিফুর রহমান বিপ্লবের নাম আলোচনায় রয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক পদে যাদের নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ মো. মাসুম বিল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক মুকিত হোসাইন, ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শেখ খালিদ হোসেন জ্যাকি, অভি আজাদ চৌধুরী নাহিদ এবং রেজাউল ইসলাম প্রিন্স।

যুবদলের সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন খন্দকার এনামুল হক এনাম। দীর্ঘদিন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে তাকে তৃণমূলের আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “দলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান যাকে যোগ্য মনে করবেন, তার নেতৃত্বেই আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব।”

এছাড়া মামুন হাসানও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন রাজপথের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে শতাধিক মামলার মুখোমুখি হলেও তিনি সংগঠন থেকে বিচ্যুত হননি বলে নেতাকর্মীদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

আকরামুল হাসান মিন্টুকেও আন্দোলন-সংগ্রামের পরীক্ষিত নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি বিভিন্ন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একইভাবে শাহ মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে থেকেছি। একাদিক মামলা মাথায় নিয়ে জেলজুলুমের শিকার হয়েছি । তারপরেও এখন নতুন বাংলাদেশ গঠনে তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত নেবেন, আমরা তা বাস্তবায়নে কাজ করব।”

পদপ্রত্যাশী নেতাদের দাবি, দায়িত্ব পেলে তারা যুবসমাজকে সংগঠিত করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবেন। পাশাপাশি মাদকমুক্ত, দক্ষ ও কর্মমুখী যুবসমাজ গড়ে তুলতে কাজ করবেন বলেও তারা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, “বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে, তাই জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে। সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেসব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্গঠন করা হবে এবং সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারাই স্থান পাবেন।”

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুবদলের নতুন কমিটি শুধু সাংগঠনিক পুনর্গঠনই নয়, বরং আগামী দিনের বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই এই কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরে এখন উৎসাহ, প্রত্যাশা এবং হিসাব-নিকাশ—সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করছে।