ঢাকা, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬,
সময়: ১০:৫৭:০১ PM

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানে ঘোষরাই সংকটে

মান্নান মারুফ
23-05-2026 06:24:37 PM
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানে ঘোষরাই সংকটে

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে বামপন্থীদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। সেই সময় রাজ্যে বিজেপির সংগঠন ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং সীমিত পরিসরে আবদ্ধ। কলকাতা কিংবা জেলার রাজনীতিতে বিজেপির তেমন কোনো প্রভাব ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু নির্দিষ্ট হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিজেপির সংগঠন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর মধ্যে ঘোষ সম্প্রদায়ের কয়েকজন নেতার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অধ্যাপক অমলকুমার ঘোষ, অসীম ঘোষ এবং মুরলীধর ঘোষের মতো নেতারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভিত্তি তৈরিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তারা দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মাঠপর্যায়ে কাজ চালিয়ে যান।

ঘোষ সম্প্রদায় হিন্দু সমাজের একটি ঐতিহ্যবাহী পেশাভিত্তিক গোষ্ঠী। প্রাচীনকাল থেকেই তাদের মূল পেশা ছিল কৃষিকাজ, গৃহপালিত পশুর দেখাশোনা এবং বিশেষ করে গরু পালন। “ঘোষ” শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। সংস্কৃত “গোষ্ঠ” শব্দ থেকে “ঘোষ” শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। “গোষ্ঠ” শব্দের অর্থ গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাপন কিংবা আওয়াজ বা ডাকাডাকি। গরু সাধারণত দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে বলেই “গো” বা “গরু” শব্দের সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সেই সূত্রে গরু পালন ও দুগ্ধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের “ঘোষ” বলা হতো।

ঘোষ সম্প্রদায়ের ভেতরেও কয়েকটি উপশ্রেণি রয়েছে। প্রধানত কুলীন বা কায়স্থ ঘোষ, গোয়ালা যাদব ঘোষ এবং সদগোপ—এই তিনটি ভাগ উল্লেখযোগ্য। কুলীন বা কায়স্থ ঘোষরা ঐতিহাসিকভাবে লেখাপড়া ও প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে গোয়ালা ঘোষদের প্রধান পেশা ছিল গরু পালন, দুধ বিক্রি এবং দুধজাত মিষ্টি প্রস্তুত করা। পশ্চিমবঙ্গের বহু বিখ্যাত মিষ্টির দোকান এখনও ঘোষ সম্প্রদায়ের মানুষদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এই পেশার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বহু প্রজন্মের।

রাজনৈতিকভাবে ঘোষ সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ বিজেপির সমর্থক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিশেষ করে যখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল ছিল, তখন এই সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ দলটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গরু বেচাকেনা ও জবাই সংক্রান্ত কঠোর আইন এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাদের জীবিকায় প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গরু জবাই এবং গরু পরিবহন নিয়ে নানা ধরনের আইন রয়েছে। অনেক স্থানে কম বয়সি গরু জবাই নিষিদ্ধ এবং গরু পরিবহনের ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে গরু পালন ও বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ওপর। ঘোষ সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার গরু পালনকে কেন্দ্র করে জীবন-জীবিকা পরিচালনা করে। তারা ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গরু কেনেন, লালনপালন করেন এবং পরে বিক্রি করে সেই ঋণ পরিশোধ করেন।

কিন্তু গরু বিক্রির বাজার সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় এখন অনেক খামারি আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে মুসলিম ক্রেতাদের একটি বড় অংশ গরু কেনাবেচা থেকে সরে আসার কারণে বাজারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বহু গরুপালক পরিবার ক্ষতির মুখে পড়ছে। বয়স্ক গরুর ক্রেতা না থাকায় খামারিদের জন্য গরু রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ছে।

সমালোচকদের মতে, বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই ঘোষ সম্প্রদায়ের মানুষরাই এখন সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তারা মনে করছেন, যে নীতিগুলো ধর্মীয় আবেগকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে, সেগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ফলে গরু পালন ও দুগ্ধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহু পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বিষয়টি শুধু ধর্মীয় বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। গরু সংরক্ষণ, কৃষি অর্থনীতি, পশুপালন এবং গ্রামীণ বাজার—সবকিছুর সঙ্গে এটি জড়িত। তাই এ ধরনের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পশ্চিমবঙ্গের ঘোষ সম্প্রদায়ের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, ঐতিহ্যবাহী পেশা এবং সামাজিক বাস্তবতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিজেপির উত্থানে ভূমিকা রাখা এই সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ আজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের দাবি, ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি জীবিকার প্রশ্নেও বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন।