ঢাকা, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬,
সময়: ০৩:২৪:৫৯ PM

বিএনপিতে পরিকল্পিত টার্গেট, নাকি অভ্যন্তরীণ সংকট?

মান্নান মারুফ
23-05-2026 02:41:11 PM
বিএনপিতে পরিকল্পিত টার্গেট, নাকি অভ্যন্তরীণ সংকট?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা ও বিরোধী রাজনীতির দ্বন্দ্ব সবসময়ই বহুমাত্রিক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে কৌশল, প্রচারণা, সাংগঠনিক প্রভাব এবং জনমত নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতাকে ঘিরে যেভাবে বিতর্ক, সমালোচনা ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ঢাকার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ডাকসাইটে নেতাদের একজন হিসেবে পরিচিত মির্জা আব্বাস। আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক দৃঢ়তা এবং মাঠকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে তিনি বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে গত কয়েক বছরে তাকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে দলীয় মহলে। বিএনপির একটি অংশের দাবি, পরিকল্পিতভাবে তাকে আক্রমণ, সমালোচনা এবং ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার প্রবণতা তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু থেকে আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে তার শারীরিক অসুস্থতাও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঞ্চলে শক্তিশালী সাংগঠনিক নেতাদের দুর্বল করে দেওয়া হলে সেটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো দলের ওপর পড়ে। কারণ রাজধানীর রাজনীতি শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং জাতীয় রাজনৈতিক বার্তা তৈরির অন্যতম কেন্দ্র। সেই জায়গায় মির্জা আব্বাসের মতো অভিজ্ঞ নেতাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিতর্ককে বিএনপির সাংগঠনিক ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একই ধরনের আলোচনা এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামকেও ঘিরে তৈরি হয়েছে। সেখানে জনপ্রিয় নেতা ও মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমালোচনা এবং চাপের বিষয়টি বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তার জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ককে অনেকেই শুধুমাত্র স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখছেন না; বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলেই মনে করছেন।

দলটির অভ্যন্তরে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে, বিএনপির যেসব নেতা মাঠপর্যায়ে জনসমর্থন, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আলোচনায় থাকেন, তাদের নিয়েই ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে এখন আলোচনায় এসেছে সিলেটের সাবেক মেয়র এবং বর্তমান প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর নামও। রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে যে, তাকে নিয়েও নানাভাবে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও বিএনপির একটি অংশ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় দলের প্রভাবশালী নেতাদের ঘিরে নানা ধরনের বিতর্ক, মামলা, দমন-পীড়ন কিংবা রহস্যজনক ঘটনার উদাহরণ নতুন নয়। বিশেষ করে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি এখনো দেশের রাজনীতিতে গভীর আলোচনার বিষয়। সেই সময় বিরোধী দল অভিযোগ করেছিল যে, তাকে পরিকল্পিতভাবে গুম করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও মতভেদ রয়েছে এবং ঘটনাটির পূর্ণ সত্য আজও অমীমাংসিত।

কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, অতীতে প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ বা রহস্যজনক ঘটনার মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার একটি প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বহুবার দেখা গেছে। তাদের মতে, কোনো দলের সাহসী ও জনপ্রিয় নেতাকে টার্গেট করা হলে সেটি অন্য নেতাদের মধ্যেও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে। যদিও এসব বিশ্লেষণের পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ সবসময় পাওয়া যায় না, তবুও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দলীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ক্ষমতার অংশীদার হলেও দলটির ভেতরে অনেকেই মনে করছেন, বিরোধী শক্তিগুলো এখনও বিভিন্ন উপায়ে প্রভাব বিস্তার করছে। তাদের অভিযোগ, অতীতে এক ধরনের কৌশল ব্যবহার করে বিএনপির নেতাদের কোণঠাসা করা হয়েছিল, এখনো অনেক ক্ষেত্রে একই ধরণের কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, গুজব ছড়ানো এবং সাংগঠনিক বিভক্তি তৈরির মাধ্যমে জনপ্রিয় নেতাদের দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলে তারা দাবি করছেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বাহ্যিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুললেই চলবে না; বিএনপিকে নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কোনো রাজনৈতিক দল তখনই শক্তিশালী থাকে, যখন তার অভ্যন্তরীণ ঐক্য দৃঢ় থাকে এবং নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বজায় থাকে। জনপ্রিয় নেতাদের ঘিরে বিভ্রান্তি বা অপপ্রচার তৈরি হলে দলীয়ভাবে দ্রুত ও কৌশলী প্রতিক্রিয়া জানানোও জরুরি।

বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দলের প্রভাবশালী ও জনসম্পৃক্ত নেতাদের ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ মহলের মতে, সতর্কতা, সাংগঠনিক ঐক্য এবং তথ্যভিত্তিক রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। অন্যথায়, একের পর এক প্রভাবশালী নেতাকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট ভবিষ্যতে দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।