ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৮:৫৪:১১ PM

তিন মুসলিম কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত

ডেস্ক রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
01-10-2026 12:47:38 PM
তিন মুসলিম কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফর ঘিরে তিন জ্যেষ্ঠ মুসলিম আইএএস ও আইপিএস কর্মকর্তাকে সরকারি বৈঠক ও প্রটোকল কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তাঁর দাবি, জুলাই ও আগস্টে অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় তিন কর্মকর্তার সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে এবং তাঁদের তিনজনের মধ্যে একমাত্র অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়। তবে অভিযোগগুলো এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার বা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। 

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার সৈয়দ ওয়াকার রাজা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) প্রধান জাভেদ শামীম এবং ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস বিভাগের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব খলিল আহমেদ।

মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ অনুযায়ী, ১৮ জুলাই শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় অমিত শাহের সভাপতিত্বে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপার ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সৈয়দ ওয়াকার রাজাকে বৈঠক থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয়। মৈত্রের অভিযোগ, বৈঠকের বাকি সময় তিনি তাঁর স্ত্রী শামা পারভীনের দপ্তরে অবস্থান করেন। শামা পারভীন বর্তমানে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের সিনিয়র সচিব হিসেবে কর্মরত। 


মৈত্র আরও অভিযোগ করেন, অমিত শাহকে স্বাগত ও বিদায় জানানোর জন্য নির্ধারিত সরকারি প্রটোকল দলেও ওয়াকার রাজাকে রাখা হয়নি। তাঁর পরিবর্তে উত্তরবঙ্গের আইজি সুকেশ জৈনকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে মৈত্রের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। 


একই বৈঠকে এসটিএফের মহাপরিচালক জাভেদ শামীমকেও উপস্থিত না থাকতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন মৈত্র। তাঁর পরিবর্তে এসটিএফের প্রতিনিধিত্ব করেন আইজি গৌরব শর্মা। মৈত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, সিআইডি, ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ, সাইবার সেলসহ পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত শাখার শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠকে থাকলেও এসটিএফের প্রধান সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। 

 

পরদিন, ১৯ জুলাই কলকাতায় আইনশৃঙ্খলা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি নিয়ে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মৈত্রের অভিযোগ, ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা খলিল আহমেদ বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে সেখানে থাকতে পারেননি এবং তাঁকে চলে যেতে বলা হয়। একই সময়ে জাভেদ শামীমকেও বৈঠকে না থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। 


মহুয়া মৈত্রের দাবি, জুলাইয়ের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ছিল না। ২০ থেকে ২২ আগস্ট অমিত শাহের দ্বিতীয় দফার পশ্চিমবঙ্গ সফরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় ওয়াকার রাজাকে আবারও শিলিগুড়ির সীমান্ত নিরাপত্তা পর্যালোচনা বৈঠক থেকে দূরে রাখা হয় এবং জাভেদ শামীমকে নতুন ফৌজদারি আইনসংক্রান্ত একটি সরকারি প্রদর্শনীতে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এসটিএফের প্রতিনিধিত্ব সেখানেও করেন গৌরব শর্মা। 


এই ঘটনাগুলোর পর ১৬ সেপ্টেম্বর মহুয়া মৈত্র জাতিসংঘের সংখ্যালঘুবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক নিকোলাস লেভরাতের কাছে চিঠি দেন। একই অভিযোগ তিনি ভারতের জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশনের কাছেও উত্থাপন করেন। চিঠিতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার কারণ, কার নির্দেশে তাঁদের সরিয়ে রাখা হয়েছিল এবং এ বিষয়ে সরকারি নথি সংরক্ষণের দাবি জানান। তিনি অমিত শাহের সফরের সিসিটিভি ফুটেজ, ট্যুর ডায়েরি ও অন্যান্য নথি সংরক্ষণেরও অনুরোধ করেন। 


জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন বিষয়টি আমলে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে প্রতিবেদন চেয়েছে। কমিশন অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি; বরং রাজ্য সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। অর্থাৎ, ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগটি বর্তমানে তদন্ত ও জবাবদিহির পর্যায়ে রয়েছে। 


এরই মধ্যে বিষয়টি নতুন মাত্রা পায় সংবাদমাধ্যম ‘মাকতুব মিডিয়া’র বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মামলা দায়েরের ঘটনায়। ১৯ সেপ্টেম্বর বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় একটি এফআইআর দায়ের করা হয়। পুলিশের অভিযোগ, মাকতুবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টে মৈত্রের অভিযোগকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, বিদ্বেষ সৃষ্টি ও জনশান্তি বিঘ্নিত করতে পারে। এফআইআরে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারা যুক্ত করা হয়েছে। মাকতুব জানিয়েছে, পুলিশ তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের লগইন ও ডিভাইস-সংক্রান্ত তথ্যও চেয়েছে। অন্যদিকে, প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া মাকতুবের বিরুদ্ধে এফআইআর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, অভিযোগটি একজন নির্বাচিত সাংসদ প্রকাশ্যে তুলেছেন এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তা নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। 

ফলে ঘটনাটি এখন দুটি পৃথক প্রশ্নকে সামনে এনেছে—একদিকে সরকারি বৈঠক ও প্রটোকল থেকে তিন মুসলিম কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা এবং অন্যদিকে সেই অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপ। জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশনের তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি প্রকাশিত হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।