ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৯:৫২:০৬ PM

পদোন্নতি ঘিরে তদবিরে ব্যস্ত কর্মকর্তারা

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
03-11-2026 07:48:49 PM
পদোন্নতি ঘিরে তদবিরে ব্যস্ত কর্মকর্তারা

অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেতে প্রশাসনের একাংশের কর্মকর্তাদের মধ্যে শুরু হয়েছে জোর তদবির। এ দৌড়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা এবং বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগে আলোচিত কর্মকর্তাদের কেউ কেউ। পদোন্নতি নিশ্চিত করতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) সংগ্রহের ঘটনাও সামনে এসেছে।

এর একটি উদাহরণ স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব পরিমল সরকার। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত পদোন্নতিতে তিনি বাদ পড়েন। এবার পদোন্নতির তালিকায় থাকতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। এ জন্য তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছ থেকে নিজের পক্ষে একটি আধা সরকারি পত্র নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

গত ১৩ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহকে লেখা ওই আধা সরকারি পত্রে পরিমল সরকারকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

পত্রে বলা হয়, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা পরিমল সরকার (পরিচিতি নম্বর-৬৭৭৭) স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত। তিনি সুপারিশকারীর নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা। ২০০১ সাল থেকে সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নেও তিনি দক্ষতা ও সততার সঙ্গে কাজ করছেন। এ কারণে তাঁকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া প্রয়োজন।

চিঠিতে আরও বলা হয়, সরকারের নীতি বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে পরিমল সরকারকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে।

গত ১৭ আগস্ট ওই আধা সরকারি পত্রের ওপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ লিখেছেন, ‘মাননীয় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী অনুগ্রহ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।’

আচরণবিধিতে তদবির নিষিদ্ধ

সরকারি কর্মচারীদের চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে রাজনৈতিক বা বাইরের কোনো প্রভাব খাটানোর চেষ্টা নিষিদ্ধ। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরিসংক্রান্ত কোনো দাবির সমর্থনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকার কিংবা কোনো সরকারি কর্মচারীর ওপর রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বহিঃপ্রভাব খাটাতে বা খাটানোর চেষ্টা করতে পারবেন না।

একই বিধিমালার ২০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী নিজের পক্ষে কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য সংসদ সদস্য বা অন্য কোনো বেসরকারি ব্যক্তিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনুরোধ জানাতে পারবেন না।

এ ছাড়া ১৯৫৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জারি করা এক স্মারকেও চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপের জন্য কোনো মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের কাছে তদবির না করার বিষয়ে সরকারি কর্মচারীদের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

পদোন্নতিতে তদবিরের অভিযোগ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ পরিস্থিতিতে কিছু কর্মকর্তা জনসেবার চেয়ে তদবিরের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। পদোন্নতি ও পদায়ন নিশ্চিত করতে তাঁরা প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

অন্যদিকে, অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরাও বিধি উপেক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে আধা সরকারি পত্র পাঠাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবে তদবিরের মাধ্যমে পদোন্নতি ও পদায়ন হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে পেশাদারত্ব, জবাবদিহি ও জনসেবার পরিবর্তে তদবিরকারীদের সন্তুষ্ট রাখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

আওয়ামী আমলে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের তৎপরতা

অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি ঘিরে যেসব কর্মকর্তার নাম আলোচনায় এসেছে, তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাজনক পদে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজনও রয়েছেন বলে জনপ্রশাসনসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সদস্য হওয়ায় তাঁর মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতি নিয়ে বিশেষ তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তারিকুল ইসলাম খান, আবুল বাশার, রওনক জাহান, দীর্ঘদিন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দায়িত্ব পালন করা উর্মি তামান্না এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত মো. এনামুল হক। খায়েরুজ্জামান মজুমদারের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর পর এসব কর্মকর্তার মধ্যে পদোন্নতি নিয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া পদোন্নতির জন্য তদবির চালানোর অভিযোগ রয়েছে দিলারা বেগমের বিরুদ্ধে। তিনি প্যারিসে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে বদলি হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) থাকাকালে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগে বদলি হওয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামও পদোন্নতির আলোচনায় রয়েছেন।

এ তালিকায় আরও রয়েছেন শেখ হাসিনার শাসনামলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূইয়া, এ কে এম শওকত আলম মজুমদার, শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব গাজী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান কবির, মাহফুজা আখতার, মিজ আয়েশা হক, রিয়াসাত আল ওয়াসিফ, মো. শফিউল আলম, মো. ওসমান গনি, কাজী হাসান, তনিমা তাসমিন এবং ড. মাহে আলম।

তাঁদের মধ্যে গাজী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান কবির আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লিবিয়ায় শ্রম কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাহফুজা আখতার বিদ্যুৎ বিভাগে দায়িত্বে ছিলেন। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়েও দীর্ঘদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়নে ছিলেন মিজ আয়েশা হক।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাংস্কৃতিকবিষয়ক কমিটির সদস্য ছিলেন রিয়াসাত আল ওয়াসিফ। বাংলাদেশ টেলিভিশনের মা ও শিশু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মো. শফিউল আলমের বিরুদ্ধে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার সাবেক মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের একান্ত সচিব ছিলেন বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের পরিচালক মো. ওসমান গনি। রাজউকের পরিচালক থাকাকালে দুর্নীতি ও অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে কাজী হাসানের বিরুদ্ধে। তনিমা তাসমিন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খাদ্য অধিদপ্তরের আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ড. মাহে আলম বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে কর্মরত।

জেলা প্রশাসক ছিলেন ৩০ কর্মকর্তা

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা হলেন সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম, ঢাকার সাবেক জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম এবং ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন গাইবান্ধার সাবেক জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন, পাবনা ও বরগুনার সাবেক জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ, ময়মনসিংহ ও জামালপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ এনামুল হক, দিনাজপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম, নওগাঁর সাবেক জেলা প্রশাসক হারুন অর রশীদ, কক্সবাজার ও বাগেরহাটের সাবেক জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ, পঞ্চগড়ের সাবেক জেলা প্রশাসক ড. সাবিনা ইয়াসমিন এবং টাঙ্গাইল ও মেহেরপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক ড. আতাউল গনি।

তালিকায় আরও রয়েছেন পিরোজপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক ও সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনির একান্ত সচিব আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন, খাগড়াছড়ির সাবেক জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস, ঝালকাঠির সাবেক জেলা প্রশাসক জোহর আলী, গোপালগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা, সিরাজগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মদ, কুমিল্লা ও হবিগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবেক জেলা প্রশাসক হায়াত উদ দৌলা খান, রাজবাড়ীর সাবেক জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম, সাতক্ষীরার সাবেক জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল, লালমনিরহাটের সাবেক জেলা প্রশাসক আবু জাফর, বরগুনা ও নারায়ণগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ, ফরিদপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক অতুল সরকার, খুলনা ও মুন্সীগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান তালুকদার, নড়াইলের সাবেক জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা এবং রংপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আসিব আহসান।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে একান্ত সচিবের দায়িত্বে ছিলেন যারা

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন ২০তম ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মদ এনামুল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক একান্ত সচিব আহমদ কবীর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক একান্ত সচিব আবু আলী মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক একান্ত সচিব জাহিদুল ইসলাম এবং একই মন্ত্রণালয়ের সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মদ কামরুল হাসান।

পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় এসব কর্মকর্তার যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, কর্মদক্ষতা ও অতীতের দায়িত্ব পালনের রেকর্ড যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের পরিবর্তে মেধা, সততা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা ও পেশাগত রেকর্ডের ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা জরুরি।