ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:০৬:১৬ AM

বরিশালে শিক্ষা খাতে অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
12-10-2026 07:45:19 PM
বরিশালে শিক্ষা খাতে অনিয়মের অভিযোগ

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বদলি, ডেপুটেশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার ফাইল নিষ্পত্তিতে ঘুষ দাবি এবং হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের দাবি, আর্থিক লেনদেন ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ফাইল আটকে রাখা হয়। অভিযোগের প্রতিবাদ করলে কারণ দর্শানোর নোটিশসহ চাকরিসংক্রান্ত জটিলতায় ফেলার ভয় দেখানো হয়। এমনকি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক শিক্ষিকার মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য ৩০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগও সামনে এসেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগকারীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

মাতৃত্বকালীন ছুটিতেও ঘুষ দাবির অভিযোগ
ভুক্তভোগী এক শিক্ষিকার অভিযোগ, ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করলে তাঁর কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে কারণ দর্শানোর নোটিশের মুখে পড়ে তিনি একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই অর্থ দিয়েই তাঁকে ছুটি নিতে হয়েছে।

শিক্ষকদের ভাষ্য, মাতৃত্বকালীন ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা উত্তোলন, পেনশন, ব্যাংকঋণের কাগজপত্রে স্বাক্ষর এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা পেতে তাঁদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন ছাড়া প্রয়োজনীয় ফাইল এগোয় না বলেও অভিযোগ তাঁদের।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আবেদন, নোটিশ, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং অন্যান্য নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

বদলি ও ডেপুটেশন বাণিজ্যের অভিযোগ
শিক্ষকদের অভিযোগ, পছন্দের বিদ্যালয়ে ডেপুটেশন বা সাময়িক সংযুক্তি পেতে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগে সাতানিয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলীম ইবনাতকে পৌরসভা বিদ্যালয়ে, শাকবুনিয়ার জাকারিয়াকে লক্ষ্মীপাশা আমিনিয়া বিদ্যালয়ে, গারুড়িয়ার শারমিন আক্তারকে দেউলি বিদ্যালয়ে, মতিউর রহমান বিদ্যালয়ের শিবশংকর দাসকে খেজুরা ভরপাশা বিদ্যালয়ে এবং পোড়াচিপার আমিনুল ইসলামকে দক্ষিণ দাওকাঠি বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জান্নাতুন ফেরদৌসি, লাইজু আক্তার, ইতি আক্তার, সাথী আক্তার, সোনিয়া আক্তার, জামিল আক্তার, আনিকা ইবনাত, কাকলী দে ও নাসরিন সুলতানাসহ আরও কয়েকজন শিক্ষকের সংযুক্তি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এসব সংযুক্তি বিধিসম্মত ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আদেশ, অনুমোদন ও প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা জরুরি।

বিদ্যালয়ের বরাদ্দ থেকে টাকা কেটে রাখার অভিযোগ
বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষকরা। তাঁদের দাবি, বিদ্যালয় পর্যায়ের স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ রয়েছে।

পাশাপাশি তিন-চার বছর আগের ফাইল পুনরায় সামনে এনে বিভিন্ন ভুলত্রুটি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষকদের চাপে রাখার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কায় থাকেন।

তবে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করতে প্রকল্পের বরাদ্দপত্র, ব্যয়ের হিসাব, বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক রেকর্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ঘুষ আদায়ে মধ্যস্থতাকারী ব্যবহারের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে কয়েকজনকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ-সংক্রান্ত অভিযোগে সাবেক শিক্ষক সেলিম, সহকারী শিক্ষক সালেহীন শিকদার এবং প্রধান শিক্ষক পরশের নাম উল্লেখ করেছেন তাঁরা।

এ ছাড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে তাঁর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী স্ত্রী ও ছোট ভাই নুরুলকে ব্যবহার করে শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

অবৈধ সম্পদের অভিযোগও আলোচনায়
এর আগে প্রকাশিত ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রুহুল আমিনের কথিত বিপুল সম্পদ ও আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষকদের হয়রানি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁদের অভিযোগে কুয়াকাটার হোটেল জননীসহ বিভিন্ন সম্পদের প্রসঙ্গও এসেছে।

তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সম্পদ বিবরণী, দলিল, আয়কর নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল প্রয়োজন। অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার আগে এসব তথ্য যাচাই করা জরুরি।

বক্তব্য দিতে রাজি হননি কর্মকর্তা
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

এদিকে বাকেরগঞ্জের কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, তাঁরা দুদক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করতে হবে। কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর কারণে কোনো শিক্ষক যেন প্রশাসনিক হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকদের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই ঘুষ দাবি, বদলি ও ডেপুটেশন বাণিজ্য এবং বরাদ্দের অর্থে অনিয়মের মতো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বাকেরগঞ্জের শিক্ষকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করবে। একই সঙ্গে বদলি, ডেপুটেশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন ও বিদ্যালয়ের বরাদ্দসংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে, যাতে শিক্ষকরা হয়রানি ছাড়াই তাঁদের ন্যায্য সেবা পান।