ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৮:৪৭:৪১ PM

সমবায়ে দুর্নীতির অভিযোগ, কাঠগড়ায় নবীরুল

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
05-10-2026 08:15:59 PM
সমবায়ে দুর্নীতির অভিযোগ, কাঠগড়ায় নবীরুল

সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক (অডিট ও আইন) মো. নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জালিয়াতি, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও শারীরিক নির্যাতনসহ নানা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত, কারণ দর্শানোর নোটিশ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাগুরার লক্ষীকোল গ্রামের বাসিন্দা ও মৃত মো. সহিদুল ইসলামের ছেলে নবীরুল ইসলাম ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে সমবায় ক্যাডারে সহকারী নিবন্ধক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়ম ছিল। তাঁর বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তিনি চাকরি নিয়েছেন—এমন অভিযোগে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকার কাফরুল থানায় একটি মামলা হয়। মামলাটি তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো তদন্ত করে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিসিএস পরীক্ষার আগে নবীরুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (বিপিএসসি) জুনিয়র গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় বিপিএসসির তৎকালীন সদস্য মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে অর্থের বিনিময়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাইয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২০০১ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর কর্মকর্তা এস এম আকতার হামিদ ভূঁঞা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেন। পরে তদন্তে তাঁর পক্ষে সাজানো প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগও ওঠে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

বিপিএসসিতে কর্মরত থাকাকালে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়ার নামে ৩ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে। এ অভিযোগের তদন্তে ২০০২ সালের ২ জুলাই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়।

কাফরুল থানার মামলাটি পরবর্তী সময়ে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে বিশেষ মামলা নম্বর ৬৯/২ হিসেবে বিচারাধীন ছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রপক্ষকে মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে নবীরুল ইসলাম মামলাটি থেকে অব্যাহতি পান। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি ও সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রয়োজন।

চাকরিজীবনের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিয়েও নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পেতে তৎকালীন সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ ওই পদে অন্য একজন যোগ্য কর্মকর্তাকে পদায়নের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।

ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে সমবায় সমিতির নিবন্ধন, পরিদর্শন এবং ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিদিন একাধিক সমিতি পরিদর্শন এবং নতুন সমিতি নিবন্ধনের নামে অবৈধ অর্থ আদায় করা হতো। মাত্র সাত থেকে আট মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি সমিতির নিবন্ধনের বিপরীতে ৪৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মিরপুরের একটি সমবায় প্রতিষ্ঠানের অ্যাডহক কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা এবং ‘দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ (ব্যাংক) লিমিটেড’-এর অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও একটি ব্যাংক হিসাব থেকে ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত বিলম্বের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। এ বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদের তদন্ত প্রতিবেদনে কিছু অভিযোগ উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

মোহাম্মদপুর পি.সি. কালচার হাউজিং সোসাইটির ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনেও আদালতের নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রীর নামে তিন কাঠা জমি নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিষিদ্ধ ‘যুবক’-এর কার্যক্রম চালু রাখতে ভুয়া সমিতির নিবন্ধন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মাত্র তিন মাসে প্রায় ১৫০টি সমিতির নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল।

নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও পুরোনো। ২০০৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের এক পরিচালককে সমবায় ভবনের সামনে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তৎকালীন অতিরিক্ত নিবন্ধক কায়সারুল আলমের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দাবি করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

২০১২ সালে রাজশাহীর বিভাগীয় দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে বন্ধকী জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে। এ ঘটনায় আপত্তি জানানো এক কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়েও অভিযোগের ধারাবাহিকতা রয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট আগারগাঁওয়ে সমবায় অধিদপ্তরের কার্যালয়ে ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নবনির্বাচিত কমিটির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম সজীবের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। সাইফুল ইসলাম সজীব এ ঘটনায় নবীরুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। মামলায় আরও কয়েকজনের নাম এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন বলে জানা গেছে।

তবে এ ঘটনার নথিতে মামলার তারিখ নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। হামলার তারিখ ১৯ আগস্ট ২০২৬ উল্লেখ করা হলেও কোথাও মামলা দায়েরের তারিখ ২৪ আগস্ট ২০২৩ লেখা হয়েছে। ফলে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট থানার মামলা ও এজাহারের মূল কপি দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বদলি, পদোন্নতি ও বিভিন্ন সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন ও কারণ দর্শানোর নোটিশ থাকার পরও তিনি কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে নবীরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। লিখিত প্রশ্নও পাঠানো হয়। তবে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর অবস্থান এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে যেসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে, সেসব বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে যেসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন বা প্রমাণিত হয়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।